নিউইয়র্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার বা ‘লক্ষ কোটিপতি’ হওয়ার গৌরব অর্জনের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় সেই খেতাব হারালেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্সের শেয়ার বাজারে অভিষেকের পর তৈরি হওয়া বিপুল উন্মাদনা কেটে যাওয়ার পরপরই তাঁর এই সম্পদহানি ঘটেছে।
নিউইয়র্ক সময় প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৫টায় হালনাগাদ হওয়া ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স-এর মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ৯৫৭ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৭২৭ বিলিয়ন পাউন্ড) নেমে এসেছে। অথচ দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে তাঁর সম্পদের মূল্যমান ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বাজারে আকস্মিক মন্দা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দীর্ঘমেয়াদী লাভ বিবেচনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান সন্দেহের জেরে স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের দরপতন ঘটে। আর তাতেই মাস্কের এই বিশাল সম্পদের অবমূল্যায়ন হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
তবে এই বিপুল পরিমাণ লোকসানের পরও ইলন মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তাঁর সম্পদের ব্যবধান এখনও অনেক বেশি।
গত ১২ জুন নাসডাক শেয়ার বাজারে ইলন মাস্কের রকেট ও স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল প্রতীক্ষিত অভিষেকের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছিলেন মাস্ক। আইপিও-তে (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ধরা হয়েছিল ১৩৫ ডলার, যা লেনদেনের শুরুতে ১৫০ ডলারে পৌঁছায়।
এই ব্লকবাস্টার আইপিও-র ফলে স্পেসএক্সের বাজার মূল্য দাঁড়ায় ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানা প্রায় ৪২ শতাংশ হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে ১ ট্রিলিয়ন বা এক লক্ষ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপর ১৬ জুন বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ২২৫ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছালে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে।
কিন্তু এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রযুক্তির অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিপুল খরচ এবং সুদের হারের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের ধস নামে। এনভিডিয়া, ইনটেল এবং এএমডি-র মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই মন্দার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে স্পেসএক্সের ওপর। জুনের মাঝামাঝির সর্বোচ্চ দর থেকে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৩০ শতাংশেরও বেশি কমে প্রায় ১৫৬ ডলারে নেমে আসে। গত ২২ জুন, এক তীব্র অস্থিরতাপূর্ণ সোমবারে মাত্র এক দিনেই স্পেসএক্সের ১৬ শতাংশ দরপতনের ফলে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার মুছে যায়।
এর পরদিনই তাঁর বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস পায়, যা আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়। টেসলায় মাস্কের মালিকানা প্রায় ১২ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইলন মাস্কের সম্পদের এই অস্থিরতার মূল কারণ হলো তাঁর একক কেন্দ্রীভূত বিনিয়োগ। প্রথাগত বিলিয়নেয়ারদের মতো বিভিন্ন খাতে সম্পদ ছড়িয়ে না রেখে তাঁর মোট সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশই রয়েছে স্পেসএক্সে এবং বাকি অংশ টেসলায়। ফলে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য ওঠানামাতেই তাঁর মোট সম্পদে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
আর্থিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এজে বেল-এর প্রধান আর্থিক বিশ্লেষক ড্যানি হিউসন বলেন, ‘স্পেসএক্সের মতো শেয়ারের ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্তই আবেগতাড়িত এবং মহাকাশ অভিযানের বিশাল সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হতে পারে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময় বাস্তবসম্মত এবং ধৈর্যশীল হওয়া প্রয়োজন, এমনকি যখন এর পেছনে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকে।’
আগামী জুলাইয়ের শেষের দিকে কোম্পানির ভেতরের কর্মকর্তাদের শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বাজার আরও কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, স্পেসএক্সের শেয়ার মাত্র ৬ শতাংশ ঘুরে দাঁড়ালেই মাস্ক আবারও তাঁর ট্রিলিয়নেয়ার মর্যাদা ফিরে পাবেন। ফলে বিশ্বের প্রথম ‘পুনরাবৃত্তিমূলক ট্রিলিয়নেয়ার’ হিসেবেও তাঁর নাম লেখানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।