ডিজিটাল বিপ্লব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে বর্তমান যুগের প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু লাভবান হয়নি। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানগুলোও এর সুবিধা নিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন মানুষ ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিক এবং জেনারেটিভ এআইয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে সাড়া ফেলেছেন। এমন নয়জন শীর্ষস্থানীয় চিফ ডিজিটাল অফিসারের কৃতিত্বের গল্প নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন পল্লব শাহরিয়ার
দ্য হেইনেকেন কোম্পানি
রোনাল্ড ডেন এলজেন দ্য হেইনেকেন কোম্পানির বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, উৎপাদনব্যবস্থার এবং সাপ্লাই চেইনের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর ৩০ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে হেইনেকেন ইউএসএর সিইও হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রোনাল্ড মূলত ক্লাউড ব্যাকবোন আধুনিকায়ন ও জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডের সামগ্রিক ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
১৮৬৪ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম পুরোনো ও শীর্ষস্থানীয় পানীয় প্রস্তুতকারক জায়ান্ট এই প্রতিষ্ঠানে ৮৭ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় ৩৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ইউরো।
সুইস রি
প্রাভিনা লাদভা ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সুইস রি-এর প্রযুক্তিগত এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। আর্থিক প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেত্রী বার্কলেকার্ড এবং স্যানটান্দারের মতো বিখ্যাত গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা এআই এবং আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক ব্যবহার করে ঝুঁকির পূর্বাভাস দেওয়া এবং বিমা দাবি মেটানোর গতি বাড়ানোর কাজ করছেন। তাঁর সফল ডিজিটাল নেতৃত্বের ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মী নিয়মিত কাজের সুবিধার্থে জেনারেটিভ এআই টুল ব্যবহার করছেন। সুইস রি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৮৬৩ সালে, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে। বিশ্বজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানের ৮০টির বেশি অফিসে ১৪ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিমা রাজস্ব প্রায় ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ইউএস ব্যাংক
ডমিনিক ভেনচুরো ইউএস ব্যাংকের সব প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল কৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযোজন এবং গ্রাহকমুখী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই ব্যাংকে তাঁর দীর্ঘ ২৬ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর সফল ডিজিটাল দূরদর্শিতার কারণে ইউএস ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপটি এই শিল্পে নম্বর ওয়ান রেটিং পেয়েছে। এ ছাড়া অ্যাপল পে, গুগল পে এবং জিলের মতো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যাংকে চালুর ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। ১৮৬৩ সালে চালু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানে এখন প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ কর্মী কর্মরত আছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক নেট রাজস্ব বা আয় ২৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
রিও টিন্টো
রিও টিন্টোর বিশ্বব্যাপী এন্টারপ্রাইজ এবং খনি পরিচালনসংক্রান্ত সব ডিজিটাল কৌশল, ডেটা ম্যানেজমেন্ট এবং প্রযুক্তিগত প্রোগ্রামের সামগ্রিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড্যানিয়েল ইভান্স। এই সংস্থায় তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি খনি পরিচালনব্যবস্থাকে নিরাপদ, দক্ষ এবং পরিবেশবান্ধব করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনারেটিভ এআই এবং অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালিটিকের নিখুঁত ব্যবহার নিশ্চিত করছেন। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রিও টিন্টো বিশ্ববিখ্যাত খনি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী বহুজাতিক জায়ান্ট। বিশ্বজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায় প্রায় ৬০ হাজার কর্মী কাজ করছেন। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক মোট আয় ছিল ৫৭ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
চাব লিমিটেড
আমেরিকান-সুইস বহুজাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান চাব লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, চিফ ডিজিটাল বিজনেস অফিসার ও চিফ অ্যানালিটিক অফিসার শন রিংস্টেড। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ ডিজিটাল বিজনেস ইউনিটের সামগ্রিক রাজস্ব বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রোডাক্ট ডিজাইন এবং পুরো বিশ্ব পার্টনারশিপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। বিমা শিল্পে
৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই দূরদর্শী নেতা মূলত ইনস্যুরেন্সের পলিসি তৈরি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যাডভান্সড অ্যানালিটিক এবং ডেটা প্রযুক্তির নিখুঁত সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তাঁর সফল ডিজিটাল কৌশলের একটি বড় উদাহরণ হলো চাব স্টুডিও, যা বিশ্বজুড়ে ২৫০টির বেশি ফিনটেক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ডিজিটাল বিমা-সেবা দিচ্ছে। ১৮৮২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ৫৪টির বেশি দেশে ৪৫ হাজারের বেশি কর্মী এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৫৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে।
ইউপিএস
ইউনাইটেড পার্সেল সার্ভিস বা ইউপিএসের বৈশ্বিক ডিজিটাল রূপান্তর, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সামগ্রিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন বালা সুব্রামনিয়াম। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ২৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন
এই দূরদর্শী নেতা ইউপিএসকে একটি সাধারণ লজিস্টিকস কোম্পানি থেকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লজিস্টিকস অর্কেস্ট্রেটরে রূপান্তর করেছেন। তাঁর এআই-চালিত এবং সেন্সরভিত্তিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নের ফলে প্যাকেজ ভুল ট্রাকে লোড হওয়ার হার ৬৭ শতাংশ কমে গেছে। ইউপিএস ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার একটি সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট জায়ান্ট। বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ লাখ কর্মী কাজ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৮৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল
নীলাঞ্জন আঢ্য (নীল) লিংকন ফাইন্যান্সিয়ালের সব কটি প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং অ্যানালিটিক কৌশলের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে ২৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই দূরদর্শী নেতা প্রতিষ্ঠানের ইনস্যুরেন্স পলিসি তৈরি, বিমা দাবি কিংবা ক্লেইম মেটানো, দৈনন্দিন অপারেশন এবং গ্রাহকসেবার মতো মূল ক্ষেত্রগুলোতে এআইয়ের আধুনিক ব্যবহার নিশ্চিত করছেন। লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান। এতে বর্তমানে ১১ হাজারের বেশি কর্মী কর্মরত। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় ছিল ১৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
দ্য লেগো গ্রুপ
অতুল ভরদ্বাজ ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে দ্য লেগো গ্রুপের বিশ্বব্যাপী সব ডিজিটাল এবং প্রযুক্তিগত দল ও কৌশলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি লেগো ফ্যান, শিশু, পরিবার এবং রিটেইল পার্টনারের জন্য আধুনিক ডিজিটাল পণ্য ও সেরা ইউজার এক্সপেরিয়েন্স তৈরি করা তাঁর দলের মূল কাজ। ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টিক ব্লকের পাশাপাশি ক্লাউড আর্কিটেকচার আধুনিকায়ন, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জেনারেটিভ এআই ও এআর/ভিআর গেম প্রযুক্তির মিশ্রণ ঘটানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক রূপান্তর ত্বরান্বিত করছেন তিনি। ডেনমার্কে ১৯৩২ সালে বহুজাতিক ব্র্যান্ড দ্য লেগো গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন শাখা ও কারখানায় প্রতিষ্ঠানটির ৩১ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করে চলেছেন। গত অর্থবছরে বার্ষিক আয় ছিল ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফাইজার
লিডিয়া ফনসেকা ফাইজারের বিশ্বব্যাপী সব ডিজিটাল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত পণ্যের কৌশলগত রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোভিড-১৯ মহামারিতে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ডেটা ট্র্যাকিং এবং সাপ্লাই চেইন অটোমেশনের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত কম সময়ে ফাইজারের ভ্যাকসিন এবং ওরাল ট্রিটমেন্ট বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১০ কোটির বেশি ট্রানজেকশনের ৯০ শতাংশের বেশি স্বয়ংক্রিয় করেছেন তিনি। এ ছাড়া জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে নতুন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কারের গতি বাড়াতে এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য চার বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যমান তৈরি করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ফাইজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতকারক বহুজাতিক জায়ান্ট। বিশ্বজুড়ে এদের প্রায় ৮১ হাজার কর্মী আছেন। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রাজস্ব ছিল প্রায় ৬২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।