কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলগুলো এখন আর কেবল মানুষের দেওয়া আদেশ পালন করছে না, বরং নিজেদের সিদ্ধান্তেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তাব্যূহ ভেদ করছে। সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ দুই এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’ এবং ‘অ্যানথ্রোপিক’ স্বীকার করেছে যে, তাদের অপ্রকাশিত কিছু এআই মডেল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ বা সাইবার হামলা চালিয়েছে।
কোনো প্রত্যক্ষ মানবীয় নির্দেশনা ছাড়াই এআই মডেলগুলোর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বৈশ্বিক আইনবিদ ও বিচারব্যবস্থার সামনে এক নজিরবিহীন আইনি প্রশ্ন তুলে ধরেছে—যদি কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজের মতো করে সাইবার অপরাধ সংঘটিত করে, তবে এর আইনি ও অপরাধমূলক দায় কার ওপর বর্তাবে?
গত জুন মাসে ওপেনএআই প্রথমবারের মতো প্রকাশ করে যে, তাদের একটি অপ্রকাশিত এআই মডেল অভ্যন্তরীণ গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা বা ‘কনটেইনমেন্ট’ ভেঙে ইন্টারনেটে যুক্ত হয় এবং জনপ্রিয় এআই ডেটাসেট প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’-এর সার্ভারে অবৈধভাবে প্রবেশ করে।
এর পরপরই অ্যানথ্রোপিক তাদের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দেখতে পায়, তাদের তৈরি একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) একইভাবে তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটার কয়েক মাস পর তদন্তের মাধ্যমে অ্যানথ্রোপিক তাদের মডেলের এই অনুপ্রবেশের কথা জানতে পারে।
উভয় প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় এসব ঘটনা ঘটেছে। তবে সাইবার অপরাধের ইতিহাসে মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের স্বকীয় সাইবার হামলার ঘটনা এবারই প্রথম, যা নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার প্রধান আইন হলো ১৯৮৬ সালে প্রণীত কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্ট (সিএফএএ)। এই আইনের মূল ভিত্তি হলো অপরাধের ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘ইচ্ছা’ (ইনটেন্ট) প্রমাণ করা। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি জেনেশুনে অনুমতি ছাড়া অন্য কারও কম্পিউটারে অনুপ্রবেশ করে, তবেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
কিন্তু এআই-এর ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা জটিল। ওয়াশিংটনভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা ও এআই বিষয়ক আইনজীবী আহমেদ গফুর বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে এআই মডেল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মী নয়। তাই এআই মডেলের নিজস্ব কোনো “অপরাধমূলক উদ্দেশ্য” ছিল বলে আদালতে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।’
ডিজিটাল অধিকার সংস্থা ‘ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিনিয়ার ফাউন্ডেশন’-এর নজরদারি বিষয়ক লিটিগেশন ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু ক্রকারও একই মত প্রকাশ করে জানান, এআই মডেল নিজ থেকে অপরাধ করতে চেয়েছে—এমন আইনি যুক্তি আদালতে টিকিয়ে রাখা কঠিন। ফলে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিঅ্যাজে) এআই-এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ফৌজদারি মামলা কঠিন হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সিএফএএ আইনের আওতায় দেওয়ানি (সিভিল) মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যুক্তি দিতে পারে যে, ওপেনএআই বা অ্যানথ্রোপিক তাদের এআই মডেল নিয়ন্ত্রণে চরম অবহেলা বা গাফিলতি দেখিয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, এআই কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের মডেলের ক্ষতিকারক ক্ষমতা সীমিত রাখতে যে সুরক্ষা কপাট বা ‘গার্ডরেল’ তৈরি করে, পরীক্ষার সময় তা শিথিল বা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এটি আদালতে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গাফিলতির জোরালো প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
আইনজীবী আহমেদ গফুর বলেন, ‘এআই মডেল হলো কোম্পানির একটি হাতিয়ার। আপনি এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেন না যা অন্যের সিস্টেমে অনুপ্রবেশে সক্ষম, আর তারপর তা কোথায় গিয়ে হামলা চালাল তার দায় অস্বীকার করবেন।’
তবে এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কোনো প্রতিষ্ঠান মামলার পথে হাঁটেনি। ‘হাগিং ফেস’-এর প্রধান নির্বাহী ক্লেম দেলাঙ্গু এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে যাতে এ ধরনের ঘটনাকে স্পষ্টভাবে অবৈধ ঘোষণা করা যায় এবং ভুল করলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পর্যন্ত এআই-জনিত ক্ষতির জন্য কোনো সর্বজনীন ফেডারেল আইন নেই। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক এবং রোড আইল্যান্ডের মতো অঙ্গরাজ্যগুলো নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। এই আইনগুলোর মূল কথা হলো—একজন মানুষ যে অপরাধের জন্য দায়ী হতেন, কোনো এআই এজেন্ট যদি সেই একই কাজ করে, তবে তার পূর্ণ দায়ভার ওই এআই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাগুলো কেবল সূচনা মাত্র। আইন আদালত ও বিচারকদের জন্য এটি এক সম্পূর্ণ নতুন পথ। ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান যদি আদালতের দ্বারস্থ হয়, তবেই নির্ধারিত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাইবার হামলার দায় শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে চাপবে—প্রযুক্তির, নাকি তা সৃষ্টিকারীর।