হোম > প্রযুক্তি

যেভাবে বদলে গেল কানাডার প্রযুক্তির মানচিত্র

ফিচার ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির সুসজ্জিত ল্যাব আর বিশাল অঙ্কের গবেষণার বাজেট। সেই সম্ভাবনার জায়গা পেছনে ফেলে আশির দশকে একজন বিজ্ঞানী এসে নামলেন কানাডার টরন্টোতে। সহকর্মীরা অনেকেই তখন আড়ালে হেসেছিলেন। অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কারণ মেশিন লার্নিংয়ের মতো একটা অনিশ্চিত বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বড় সুযোগ হাতছাড়া করাটা অনেকের কাছেই বোকামি। কিন্তু অনিশ্চয়তাকেই বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানী জেফরি হিন্টন। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট এক কামরায় বসে শুরু হয়েছিল তাঁর নতুন পথচলা। সেই জেদই চার দশক পর বদলে দিয়েছে পুরো পৃথিবীর প্রযুক্তির মানচিত্র।

এরপর সময় গড়িয়েছে। জেফরি হিন্টনের হাত ধরে একে একে তৈরি হয়েছেন নতুন প্রজন্মের একদল তরুণ বিজ্ঞানী। তাঁদেরই একজন নিক ফ্রস্ট। তিনি দিনের বেলায় কম্পিউটার স্ক্রিনে জটিল কোডিং করেন আর রাতে টরন্টোর কোনো ক্লাবে গিটার হাতে মাতিয়ে তোলেন ইন্ডিপেনডেন্ট রক ব্যান্ড ‘গুড কিড’। পড়ালেখা শেষে ফ্রস্টের সামনে সুযোগ ছিল সিলিকন ভ্যালিতে পাড়ি জমিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার। কিন্তু তিনি টরন্টো ছাড়েননি। শুরু করেন নতুন যাত্রা। সেখান থেকেই আজ তিনি ৭ বিলিয়ন ডলারের এআই প্রতিষ্ঠান কোহিয়ার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। টরন্টোর গল্পটা শুধু গবেষণাগারেই আটকে ছিল না। এটি ছড়িয়ে পড়েছে শহরের রাজপথেও। সিলিকন ভ্যালির বাইরে গড়ে উঠেছে এক নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্র। গুগল, এনভিডিয়া, মেটা কিংবা মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টরা টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে গড়ে তুলেছে নিজেদের গবেষণাগার। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সানোফি শহরের এআই প্রযুক্তির ওপর আস্থা রেখে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক বিশাল এআই সেন্টার গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিবিআরই-এর হিসাব বলছে, প্রযুক্তির মেধা তালিকার লড়াইয়ে নিউইয়র্ককে পেছনে ফেলে বিশ্বের তিন নম্বর স্থানটি এখন টরন্টোর দখলে।

তবে এই উত্থানের নেপথ্যে ছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র যখন অভিবাসন আইন কঠিন করছিল, তখন অনেক মেধাবী প্রকৌশলী যুক্তরাষ্ট্রে টিকতে পারছিলেন না। সেই সময় অনেকেই মার্কিন এইচওয়ান-বি ভিসা হারিয়ে বাধ্য হয়ে কানাডায় আসেন। কানাডার উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়। এ রকম হাজারো আন্তর্জাতিক মেধা এসে ভিড় জমায় টরন্টোতে। ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম রেডিক্যাল ভেঞ্চারস-এর জর্ডান জ্যাকবস খুব সুন্দর করে বলছিলেন, ‘টরন্টো থেকে মাত্র ৯০ মিনিটের ফ্লাইটে আপনি ২০০ মিলিয়ন মানুষের বাজারে পৌঁছে যেতে পারেন।’ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে যখন সাম্প্রতিক শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র হয়ে উঠল, তখন এই প্রযুক্তির গুরুত্ব টের পেল কানাডা সরকার। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করলেন ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেটের একজাতীয় এআই কৌশল। জেফরি হিন্টন একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা কানাডার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এআই যদি মানুষের চাকরিও নেয়, সেই প্রযুক্তির লভ্যাংশ যেন কানাডাতেই থাকে। যাতে তা ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের কল্যাণে কর হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’

টরন্টোর আবহাওয়া সিলিকন ভ্যালির মতো অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। এখানে শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এই যেমন নিক ফ্রস্ট আর তাঁর গুরু জেফরি হিন্টন—দুজনে মিলে নিয়মিত দাবা খেলেন। খেলার ফাঁকেই চলে তর্ক। তাঁরা আলোচনা করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি নতুন কোনো জীবের জন্ম দিচ্ছে, নাকি এটি শুধুই একটি যন্ত্র? মতের অমিল থাকলেও তা দাবার বোর্ডে কোনো প্রভাব ফেলে না।

বর্তমানে কানাডার ডিজিটাল খাত দেশটির জিডিপিতে ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখছে। ওয়াবি-এর প্রতিষ্ঠাতা রাকেল উরতাসুন সায়েন্স আর টেকনোলজির সমন্বয়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাকের ব্যবসার জন্য টরন্টোতে বসেই সংগ্রহ করেছেন ১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ফান্ড। চার দশক আগে জেফরি হিন্টন যে বীজটি বুনেছিলেন, তা আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির চার দেয়ালের বাইরে এসে টরন্টো আজ বিশ্বকে দেখাচ্ছে—প্রযুক্তি কেবল অর্থের চাকচিক্য নয়, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের মেলবন্ধনেই তৈরি হয় আসল উদ্ভাবন।

সূত্র: সিএনএন