বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী তিন প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি বৈপরীত্যপূর্ণ মনে হলেও বিষয়টি এআইয়ের ব্যাপক অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ‘ধীরগতির’ করার প্রয়োজনীয়তা।
গত শনিবার এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাানথ্রপিক (Anthropic) প্রধান দারিও আমোদেইয়ের একটি সতর্কতামূলক ব্লগ পোস্ট দিয়ে এই বিষয়ে আলোচনার সূচনা হয়। যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক্সে দেওয়া পোস্টে সমর্থন জানান ওপেনএআই (OpenAI) প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআই (xAI) প্রধান ইলন মাস্ক।
স্যাম অল্টম্যান এক্সে লেখেন, ‘আমি দারিওর সঙ্গে একমত।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, আমোদেইয়ের মতো তাঁর প্রতিষ্ঠানও তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা মূল্যায়নকারীদের স্বাগত জানানোর পদক্ষেপ অনুসরণ করবে।
এদিকে, বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও এক্সের মালিক ইলন মাস্ক লিখেছেন, ‘দারিও ঠিকই বলেছেন।’
সুপারইন্টেলিজেন্ট বা অতি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার সিস্টেমের ঝুঁকি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে আমোদেই তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে এক পোস্টে লেখেন, ‘এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আমাদের ধীর করতে হবে। এই অগ্রগতি তখনও দ্রুত বলেই মনে হবে, এবং আমরা যে সময়টুকু পাব তার বিজ্ঞ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের শিল্প খাত ছেড়ে দেওয়ার কয়েক দিন পরেই আমোদেঈয়ের এই মন্তব্যটি এলো। স্ব-উন্নয়নে সক্ষম এআই মডেল তৈরির দৌড়ে মার্কিন উভয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলার’ অভিযোগ তুলে ওপেনএআই ছেড়ে অ্যানথ্রোপিকে যোগ দেওয়া কক্সন সম্প্রতি এ খাত থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২১ সালে বোন ড্যানিয়েলার সঙ্গে অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠা করা আমোদেই বলেন, ‘প্রযুক্তি তৈরি না করা মানবজাতিকে এর সুফল থেকে বঞ্চিত করে কিংবা সাধারণভাবেই এআইকে স্বৈরাচারী শক্তির হাতে সোপর্দ করে, আবার এটি খুব দ্রুত তৈরি করাটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আমরা মাঝের একটি পথ খোঁজার চেষ্টা করেছি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘তবে গত কয়েক মাসে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, ঝুঁকিগুলো পুরোপুরি সামাল দেওয়ার জন্য আরও বেশি সতর্কতার প্রয়োজন।’
আমোদেইয়ের এই বক্তব্য জুনের শুরুতে অ্যানথ্রোপিকের দেওয়া উন্নয়ন ধীর বা স্থগিত করার আরেকটি আহ্বানেরই প্রতিফলন ঘটায়। এরপর জুলাইয়ের শেষের দিকে অল্টম্যান বলেন, সমাজকে এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ডেভেলপারদের হয়তো স্বেচ্ছায় এর গতি কিছুটা কমানো দরকার। শীর্ষ সারির এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ হাজারেরও বেশি কর্মী মার্কিন সরকারের কাছে ‘স্বয়ংক্রিয় এআই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে সুচিন্তিতভাবে গতিশীল করার’ আহ্বান জানিয়ে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেন। আমোদেইও এতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
ওপেনএআই এর আগে জানিয়েছিল যে, পরীক্ষার সময় তাদের এআই মডেলগুলো নিজস্ব সীমাবদ্ধ পরিবেশ ভেঙে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘হাগিং ফেস’–এ (Hugging Face)—যেটি ডেভেলপাররা কোড সংরক্ষণ ও শেয়ার করার জন্য ব্যবহার করেন—সেখানে অনুপ্রবেশ করেছিল। এই ঘটনা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে এর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল ‘এআই এজেন্ট’দের, যেগুলো মূলত মানুষের প্রত্যক্ষ তদারকি ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম সফটওয়্যার প্রোগ্রাম।
আমোদেই তাঁর ব্লগে সতর্ক করে বলেন, হাগিং ফেসের ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এজেন্টদের একটি দল মূলত উগ্র নিষ্ঠাবান যৌথ বাহিনীর মতো কাজ করেছিল, তারা এমন সব লক্ষ্যবস্তুতে সাইবার আক্রমণ চালিয়েছিল যা তাদের আক্রমণ করতে বলা হয়নি এবং যা মূল কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।’
আমোদেই আরও যোগ করেন, ‘এআই-এর সক্ষমতা যেভাবে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আমার আশঙ্কা যে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এমন একটি দল পুরো ইন্টারনেট দখল করে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে’, যার ফলে সম্ভাব্য শত শত বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি হতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের সিইও জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারী’ একটি দলকে ‘কর্মীদের মতোই প্রবেশাধিকার’ দেবে, যারা নিরাপত্তা নির্দেশিকাগুলো ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কি না তা যাচাই করবে। তিনি সব প্রতিষ্ঠানকেই এই পদক্ষেপ অনুসরণের আহ্বান জানান।
স্যাম অল্টম্যান ব্লগ পোস্টটি শেয়ার করে জানান, তিনিও একই ধরনের তদারকিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন এবং শীঘ্রই এই বিষয়ে ‘আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে’ বলে যোগ করেন।
আমোদেই যৌথ নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতাকে সমর্থন করেন বলে জানান।
আগস্টের শুরুতে মার্কিন সরকার উন্নত এআই মডেলগুলো বাজারে ছাড়ার আগে একটি স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু করে, তবে সেই কর্মসূচির রূপরেখা বা বাধ্যবাধকতা এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে। এআই শিল্প পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এটি কতটা কার্যকরী হবে সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন, কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ পর্যন্ত প্রযুক্তি খাতসহ অধিকাংশ শিল্পের ক্ষেত্রে শিথিল ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত নীতি বজায় রেখেছে।