ঘুষ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গত আগস্টে চালু হয়েছিল আলাদা দুটো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ঘুষ ডট সাইট এবং চাঁদাবিডি ডট কম। এবার টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ বা সেবা না দেওয়া দালাল, মধ্যস্থতাকারী ও এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে চালু হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘দালাল’। প্রমাণসহ অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের সুযোগ রেখে দায়িত্বশীলভাবে অভিযোগ প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে প্ল্যাটফর্মটি যাত্রা শুরু করেছে। প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহাজাহান বাদশা শুভ সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই যাত্রা শুরুর কথা জানান।
কাজ ও সেবা নিতে অনেক মানুষ অনিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী, দালাল কিংবা এজেন্সির ওপর নির্ভর করেন। টাকা দেওয়ার পর প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়া, যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা চুক্তি অনুযায়ী সেবা না দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণসহ নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে নথিবদ্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট ডিজিটাল মাধ্যমের অভাব রয়েছে বলে মনে করে ’দালাল প্ল্যাটফর্ম’ কর্তৃপক্ষ।
এই বাস্তবতা থেকেই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, কাউকে হেয় করা বা আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং অভিযোগকারীর বক্তব্য ও প্রমাণ গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
দালাল-এ অভিযোগ জমা দেওয়ার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম, ঘটনার তারিখ ও স্থান, কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে হবে। এর সঙ্গে রসিদ, চুক্তিপত্র, ছবি, কথোপকথনের রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। তবে ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া অভিযোগ সরাসরি প্রকাশ করা হবে না। প্রশাসনিক দল অভিযোগকারীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পরিচয় ও তথ্য যাচাই করবে। পাশাপাশি প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, তথ্যের সামঞ্জস্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি পর্যালোচনা করা হবে।
যাচাই প্রক্রিয়া শেষে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া অভিযোগ জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রকাশ করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে।
অভিযোগকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, অভিযোগকারীর ই-মেইল ঠিকানা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হবে না। অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া প্রমাণের ফাইল ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং সেগুলো শুধু অভিযোগ যাচাই ও পর্যালোচনার কাজে ব্যবহার করা হবে।
অনুমোদিত অভিযোগগুলো নাম ও অবস্থান অনুযায়ী অনুসন্ধান করা যাবে। বিভাগ, জেলা এবং থানা বা উপজেলা নির্বাচন করে নির্দিষ্ট এলাকার অভিযোগ খোঁজার সুবিধাও রাখা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের সহায়তায় লাইভ চ্যাট এবং বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে।
দালাল-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাজাহান বাদশা শুভ। তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, উদ্যোক্তা ও ওয়েবসাইট নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। প্রযুক্তিকে জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক কাজে ব্যবহারের লক্ষ্য থেকেই প্ল্যাটফর্মটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে জানিয়েছেন।
শাহাজাহান বাদশা শুভ বলেন, ’টাকা দিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ বা সেবা না পাওয়া একজন মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারেন না কোথায় নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রমাণ নথিবদ্ধ করবেন। ’দালাল’ এমন একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল মাধ্যম হতে চায়, যেখানে মানুষ প্রমাণসহ অভিযোগ জানাতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য কাউকে দোষী ঘোষণা করা নয়; বরং যাচাইযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ, সচেতনতা সৃষ্টি এবং সেবার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সহায়তা করা।’
তিনি আরও বলেন, ’আমরা অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের অধিকারকে সম্মান করতে চাই। তাই যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগ প্রকাশ না করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা আমাদের নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা যাবে ঠিকানায়। দালাল-এর ওয়েবসাইটে নিবন্ধন বা লগইন করে নির্ধারিত অভিযোগ ফরম পূরণ করতে হবে। সেখানে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংযুক্ত করে অভিযোগ জমা দেওয়া যাবে। এরপর প্রশাসনিক দল অভিযোগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচাই করবে।
যাচাই ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পর জনস্বার্থ বিবেচনায় অভিযোগের একটি দায়িত্বশীল সারাংশ প্রকাশ করা হতে পারে। তবে কোনো অভিযোগ জমা পড়া বা প্রকাশিত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে দোষী প্রমাণিত—এমন নয় বলে স্পষ্ট করেছে ’দালাল’। প্ল্যাটফর্মটির দাবি, ন্যায্যতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই অভিযোগ প্রকাশের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।
এর আগে, গত ২১ আগস্ট সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সে তথ্য জানাতে চালু হয় ‘ঘুষ ডট সাইট’ । এরপর ২৫ আগস্ট চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে চালু হয় চাঁদাবিডি ডট কম।