সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ফের নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অলাভজনক গবেষণা সংস্থা টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্টের (টিটিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে ‘ন্যুডিফাই’ নামের একটি অ্যাপের হাজার হাজার বিজ্ঞাপন প্রচার করে মেটার এই প্ল্যাটফর্মগুলো। এই অ্যাপটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নগ্নতা প্রদর্শিত এবং যৌন উদ্দীপক কনটেন্ট রয়েছে।
টিটিপি ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক নিরপেক্ষ নজরদারি সংস্থা ‘ক্যাম্পেইন ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি’-র গবেষণা শাখা। সংস্থাটি জানিয়েছে, বেইজিংভিত্তিক ‘গ্যাদারওয়ান ইনকর্পোরেটেড’ নামের একটি সংস্থা চীনের যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিজ্ঞাপন দিতে চায়, তাদের সঙ্গে মেটার সংযোগ করিয়ে দেয়। এই সংস্থাটি সম্প্রতি প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি মোবাইল অ্যাপের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এসব অ্যাপ নারীদের মুখমণ্ডল নগ্ন দেহের সঙ্গে বসিয়ে ছবি তৈরি করতে এবং যৌন আবেদনময় ভিডিও বানাতে সক্ষম।
মেটার নীতিমালায় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বিজ্ঞাপন কিংবা এমন অ্যাপের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, যেগুলো ছবিতে থাকা ব্যক্তির পোশাক সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায়। কিন্তু টিটিপির গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের অ্যাপ নিয়ন্ত্রণে অ্যাপল ইনকরপোরেশন ও অ্যালফাবেট ইনকরপোরেশনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোরও বারবার ব্যর্থতা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ভুক্তভোগী এবং তাঁদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি তথাকথিত ‘ডিপফেক পর্ন’ সেবা দমনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
টিটিপির পরিচালক কেটি পল বলেন, ‘ন্যুডিফাই বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মেটা তাদের অন্যতম শীর্ষ চীনা বিজ্ঞাপন অংশীদারকে একপ্রকার ছাড় দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।’
চীনে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করা না গেলেও, বৈশ্বিক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে চাওয়া চীনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই দুটি প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রচারমাধ্যম। কেটি পলের ভাষ্য, টিটিপির অনুসন্ধান প্রমাণ করে যে ডিপফেক-নগ্ন অ্যাপের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে মেটা যেসব কথা বলে, বাস্তবে তা মেলে না। বরং এতে বোঝা যায়, ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার চেয়ে বিজ্ঞাপন থেকে আয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কোম্পানিটি।
মেটার উইমেনস সেফটি পলিসির প্রধান সিন্ডি সাউথওয়ার্থ বলেন, ‘আমাদের প্ল্যাটফর্মে সম্মতি ছাড়া তৈরি অন্তরঙ্গ ছবি বা ন্যুডিফাই অ্যাপের অনুমতি দিই না। এসবের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিই।’
মেটার এক মুখপাত্র বলেন, ‘সব বিজ্ঞাপনদাতাকেই আমাদের বিজ্ঞাপন নীতিমালা মেনে চলতে হয়। কেউ নীতিমালা বা মানদণ্ড লঙ্ঘন করলে তার বিজ্ঞাপন বাতিল, আর্থিক জরিমানা এবং বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।’
অন্যদিকে গ্যাদারওয়ান দাবি করেছে, তারা মেটার বিজ্ঞাপন নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো সম্পূর্ণ মেনে চলে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড, প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট, সম্মতি ছাড়া তৈরি এআইভিত্তিক অশ্লীল উপকরণ, শিশু নিপীড়ন ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তারা গেমিং, ই-কমার্স, বিনোদন ও আর্থিক খাতের গ্রাহকদের মেটা, গুগলের অ্যালফাবেট, বাইটড্যান্সের টিকটক এবং ইলন মাস্কের এক্স প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিতে সহায়তা করে।
ব্লুমবার্গ নিউজের প্রশ্নের জবাবে গ্যাদারওয়ান জানিয়েছে, তারা এআইভিত্তিক ন্যুডিফাইং অ্যাপ এবং ফেস-সোয়াপ (মুখ পরিবর্তন) সেবা সম্পর্কিত নতুন বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট তৈরি সাময়িকভাবে স্থগিত করছে। সংস্থাটি আরও যোগ করে, কৃত্রিম মিডিয়া বা সিনথেটিক মিডিয়ার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা ব্যাপক পরিসরে নীতিমালা পর্যালোচনা ও উন্নয়নের কাজ করছে।
১৪০ কোটি মানুষের দেশ চীনে মেটার সেবাগুলো নিষিদ্ধ হলেও কোম্পানিটি সেখান থেকে কীভাবে আয় করে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে টিটিপি। তারা জানিয়েছে, চীনের যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশে পণ্য ও সেবা বিক্রি করে, তারা গ্যাদারওয়ানের মতো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছাতে মেটার বিজ্ঞাপনসেবা ব্যবহার করে।
২০২৪ অর্থবছরে মেটা জানায়, চীন থেকে তাদের আয় ১৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা কোম্পানিটির বৈশ্বিক আয়ের ১১ শতাংশ। এরপর থেকে কোম্পানিটি চীন থেকে আয়ের হিসাব আলাদাভাবে প্রকাশ করেনি।
মেটার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরবর্তী সময়ে হুইসেলব্লোয়ার (তথ্য ফাঁসকারী) হিসেবে পরিচিত সারা উইন-উইলিয়ামস গত বছর মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, মেটা বছরের পর বছর ধরে চীনকে সেন্সরশিপ সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে চীনকে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষ্য, চীন এখনো মেটার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার, যা কোম্পানিটির চলমান আয়ের তথ্যেই প্রতিফলিত হয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা ‘কেয়ারলেস পিপল’-এ মেটায় পাবলিক পলিসি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।
সারাহর সাক্ষ্য নিয়ে মেটা কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সে সময় মেটার এক মুখপাত্র তাঁর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেটার অভ্যন্তরীণ কিছু নথিতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে চীন থেকে তাদের পাওয়া রাজস্বের প্রায় ১৯ শতাংশ এসেছিল পর্নোগ্রাফি, স্ক্যাম (প্রতারণা) ও অবৈধ জুয়ার মতো নিষিদ্ধ কনটেন্টের বিজ্ঞাপন থেকে। নথিতে আরও দেখা যায়, প্রতারণামূলক সেবার বিজ্ঞাপনে সহায়তা করা সংস্থাগুলোর একটি ছিল এই গ্যাদারওয়ান।
রয়টার্সের এই প্রতিবেদন সম্পর্কেও মেটা কোনো মন্তব্য করেনি। সে সময় কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেছিলেন, নীতিমালা লঙ্ঘনকারী বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও অপসারণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে টিটিপি যেসব বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে, সেগুলো ব্যবহারকারীদের কাছে প্রদর্শিত হওয়ার পর মেটা সরিয়ে দেয়। এসব বিজ্ঞাপনের অনেকগুলোতেই যৌন আবেদনময় ভঙ্গিতে তরুণীদের ছবি দেখানো হয় এবং সঙ্গে লেখা ছিল, ‘Create a video with any face’ (যেকোনো মুখ ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করুন)।
চীনে মেটার অফিশিয়াল ১১টি এজেন্টের একটি হিসেবে গ্যাদারওয়ানের নাম তাদের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত আছে। গ্যাদারওয়ানের ওয়েবসাইটে একটি ছবিতে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারিতে হংকংয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মেটার দুই শীর্ষ কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এক পুরস্কার গ্রহণ করছেন। তাঁদের পেছনে ব্যাকড্রপে মেটার লোগো ছিল।
গত বছর মেটা দাবি করে, ডিপফেক-নগ্নতা তৈরির অ্যাপের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ ধরনের সেবা পরিচালনার অভিযোগে হংকংভিত্তিক এক অ্যাপ ডেভেলপারের বিরুদ্ধে তারা মামলাও করেছে।
টিটিপি দেখতে পায়, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অ্যান্ড্রয়েডের ‘বিএফটার’ (BAfter) নামের একটি অ্যাপে পাঠানো হচ্ছিল। অ্যাপটি চালু করার পর তারা ‘শেয়ারজোন’ (ShareZone) নামে একটি অংশ দেখতে পায়, যেখানে নারীদের যৌন কর্মকাণ্ডে যুক্ত দেখিয়ে পর্নোগ্রাফিক ফেস-সোয়াপের সুযোগ দিচ্ছিল।
গুগল প্লে স্টোরে বিএফটার অ্যাপের রিভিউতে কয়েকজন ‘শিশু পর্নোগ্রাফি’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের এআই ভিডিও থাকার অভিযোগ তুলেছেন। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি প্রদেশভিত্তিক একটি ডেভেলপারের তৈরি এই অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে ‘সব বয়সের জন্য উপযোগী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।
মন্তব্যের জন্য বিআফটার-এর ডেভেলপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। গত ২১ জুলাই অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং গ্যাদারওয়ান জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের বিজ্ঞাপন সুবিধা স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের প্রশ্নের জবাবে মেটা জানিয়েছে, তারা ‘বিআফটার’ অ্যাপটি নিষিদ্ধ করেছে এবং আরও বেশ কিছু ন্যুডিফাই অ্যাপের লিংক ব্লক করে দিয়েছে। তবে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এবং গুগল প্লে স্টোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান গুগল এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫৭ জন কিশোর-কিশোরীর অর্ধেকেরও বেশি স্বীকার করেছে যে তারা নিজেদের বা অন্যদের অন্তত একটি ছবি তৈরিতে ন্যুডিফিকেশন টুল ব্যবহার করেছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি জানিয়েছে, তারা নিজেরাই এ ধরনের টুলের শিকার হয়েছে।
এই গবেষণার প্রধান জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ফরেনসিকস গবেষক চ্যাড এম. এস. স্টিল বলেন, অনেক কিশোর-কিশোরী ইতিমধ্যেই জানে কীভাবে মেসেজিং অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সরাসরি এই সেবাগুলোতে প্রবেশ করতে হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অ্যাপ স্টোরগুলোর এই সাময়িক পদক্ষেপে খুব বেশি লাভ নাও হতে পারে।
এদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘টেক ইট ডাউন অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করেন। এই আইনে সম্মতি ছাড়া প্রকাশিত যৌন কনটেন্ট প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের এ ধরনের পোস্ট সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে। দেশটির ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) গত মে মাস থেকে আইনটি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে টিটিপি নিশ্চিত হয় যে বিজ্ঞাপনগুলোর সঙ্গে গ্যাদারওয়ানের সংযোগ ছিল। বিজ্ঞাপনগুলোর মাধ্যমে ঠিক কতবার অ্যাপ ইনস্টল হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে টিটিপির সরবরাহ করা বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাপম্যাজিকের তথ্য অনুযায়ী, তারা যেসব অ্যাপ বিশ্লেষণ করেছে, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটির সম্মিলিত ডাউনলোড সংখ্যা বিশ্বজুড়ে ২৫ লাখেরও বেশি।