আদিগন্ত অন্ধকার আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। চারপাশে নিঃসীম শূন্যতা, নেই কোনো সাড়াশব্দ। আমাদের চেনা পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মাইল দূরে সৌরজগতে একাকী ভাসছে একটি মানবসৃষ্ট বস্তু। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সেটি নিথর অবস্থায় ছিল। কোনো শক্তি নেই, কোনো সাড়া নেই। এ যেন মহাকালের গর্ভে ঘুমিয়ে থাকা! সুদূর মহাকাশের সেই রহস্যময় কুইপার বেল্ট থেকে অবশেষে ভেসে এসেছে একটি সংকেত। জেগে উঠেছে সে। মূল কম্পিউটারে লুকিয়ে থাকা পুরোনো কিছু গোপন কমান্ড কিংবা সংকেতের ছোঁয়ায় দীর্ঘতম ঘুম ভেঙে নড়েচড়ে বসেছে নাসার দূরপাল্লার মহাকাশযান নিউ হরাইজনস।
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করেছিল নিউ হরাইজনস। মহাকাশযানটি ২০১৫ সালে মানব ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান হিসেবে বামন গ্রহ প্লুটো এবং তার উপগ্রহগুলোর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। এটি বিজ্ঞানীদের কাছে প্লুটো সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক ধারণা দেয়। পরে ২০১৯ সালে এটি বরফাচ্ছন্ন তুষারমানবের আকৃতির গ্রহাণু আরোকথকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে। নিউ হরাইজনস তাঁর দীর্ঘ সুপ্তাবস্থা বা হাইবারনেশন কাটিয়ে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও সচল অবস্থায় রয়েছে। মেরিল্যান্ডের লরেলে অবস্থিত জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড ফিজিকস ল্যাবরেটরির মিশন কন্ট্রোলাররা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জেগে ওঠার পর নিউ হরাইজনস কুইপার বেল্টের হিমায়িত বস্তুগুলোর ঘূর্ণন গতি, দিক এবং আকৃতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করছে। কুইপার বেল্ট হলো আমাদের সৌরজগতের প্রান্তে অবস্থিত ট্র্যান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্টের একটি বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল। এটি আজ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগৎ গঠনের সময়কার অবশিষ্টাংশ। এই অঞ্চলের লুকানো সব রোমাঞ্চকর তথ্য এখন পৃথিবীতে পাঠানো শুরু করে দিয়েছে এই স্পেসক্রাফট।
২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রায় নিউ হরাইজনসের দীর্ঘায়ু ও জ্বালানি সাশ্রয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল এই হাইবারনেশন বা সুপ্তাবস্থা। ২০০৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মহাকাশযানকে ২০ বারের বেশি সময় ঘুমে পাঠানো হয়েছে। এই সুপ্তাবস্থায় এটির বেশির ভাগ শক্তি বন্ধ থাকলেও মূল কম্পিউটার মহাকাশযানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতি সপ্তাহে কন্ট্রোল রুমে একটি সবুজ স্ট্যাটাস রিপোর্ট বা বিকন পাঠাত। ঘুমিয়ে থাকলেও এর যন্ত্রগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং জমা করে রাখত, যা এখন পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাকাশের এই প্রান্তে আরোকথের মতো জোড়া লাগা তুষারমানবের আকৃতির গ্রহাণু সংখ্যায় অনেক বেশি রয়েছে। এটি অন্য কোনো সৌরজগতেও বড় গ্রহ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। নিউ হরাইজনস সূর্যের চারপাশের সুরক্ষামূলক বুদ্বুদ বা হেলিওস্ফিয়ারে গ্যাসের বণ্টন পরিমাপ করছে। এটি নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হওয়া অতি দ্রুতগতির গ্যালাকটিক কসমিক রশ্মিও পরিমাপ করছে। এই হেলিওস্ফিয়ার আমাদের সৌরজগৎকে ৭০ শতাংশ ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে রক্ষা করে। মহাকাশযানটিতে থাকা ভেনেটিয়া বার্নি স্টুডেন্ট ডাস্ট কাউন্টার নামের একটি যন্ত্র বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। কুইপার বেল্টের চেনা সীমানা পার হয়ে যাওয়ার পরেও নিউ হরাইজনস এখনো প্রচুর মহাজাগতিক ধূলিকণার সন্ধান পাচ্ছে। এ সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, কুইপার বেল্ট আমরা যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাকাশের এই প্রান্তে আরোকথের মতো জোড়া লাগা তুষারমানবের আকৃতির গ্রহাণু সংখ্যায় অনেক বেশি রয়েছে। এটি অন্য কোনো সৌরজগতেও বড় গ্রহ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। নিউ হরাইজনস সূর্যের চারপাশের সুরক্ষামূলক বুদ্বুদ বা হেলিওস্ফিয়ারে গ্যাসের বণ্টন পরিমাপ করছে। এটি নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হওয়া অতি দ্রুতগতির গ্যালাকটিক কসমিক রশ্মিও পরিমাপ করছে। এই হেলিওস্ফিয়ার আমাদের সৌরজগৎকে ৭০ শতাংশ ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে রক্ষা করে। মহাকাশযানটিতে থাকা ভেনেটিয়া বার্নি স্টুডেন্ট ডাস্ট কাউন্টার নামের একটি যন্ত্র বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। কুইপার বেল্টের চেনা সীমানা পার হয়ে যাওয়ার পরেও নিউ হরাইজনস এখনো প্রচুর মহাজাগতিক ধূলিকণার সন্ধান পাচ্ছে। এ সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, কুইপার বেল্ট আমরা যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
নিউ হরাইজনসের বর্তমান বর্ধিত মিশনের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। তবে মহাকাশযানটি ঠিক থাকলে এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে। ২০২৯ সালের পর মিশনটি দীর্ঘায়িত হলে এটি নাসার ঐতিহাসিক ভয়েজার মহাকাশযানের পথ অনুসরণ করবে। কারণ, এর বর্তমান গতিপথ এটিকে একসময় হেলিওস্ফিয়ারের সুরক্ষা সীমানা ছাড়িয়ে চিরতরে ইন্টারস্টেলার স্পেস কিংবা আন্তনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে নিয়ে যাবে।
সূত্র: নাসা, সিএনএন