আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় কার ভূমিকা কতটুকু
অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে রয়েছে বাস্তব শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তবে শিক্ষকেরা নির্দিষ্ট সময় পর অবসরে চলে যান। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির কাছে রয়েছে হাজার হাজার পাঠ পরিকল্পনার তথ্য। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে দিতে পারে এটি। ২০২২ সালে জেনারেটিভ এআই আত্মপ্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষক নাকি এআই—কার কাছে যাবে শিক্ষার্থীরা? একদিকে এআই অভূতপূর্ব উৎপাদনশীলতার সুযোগ তৈরি করেছে এবং ব্যবহারকারীদের প্রায় যেকোনো প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিচ্ছে। অন্যদিকে সবকিছুর জন্য অতিরিক্ত এআই-নির্ভর হয়ে পড়ার কারণে মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিচারবুদ্ধি এবং সৃজনশীল দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে এই আশঙ্কাটি গভীর। কারণ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান তত্ত্ব এবং ভবিষ্যতে সেগুলো প্রয়োগের মূল সেতু হিসেবে কাজ করে। প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সন্ধিক্ষণে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় এআই কি তবে মানুষের জায়গা দখল করে নেবে?
এআই নিজে থেকে ক্ষতিকর বা উপকারী কোনো শক্তি নয়। এর প্রভাব সম্পূর্ণ নির্ভর করে এটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর। মানুষ এবং এআই উভয়েরই নিজস্ব কিছু বিশেষ শক্তি রয়েছে। এআই সুনির্দিষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ কাজগুলো নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে পারে। অন্যদিকে মানুষ মানবিক বুদ্ধিমত্তা ও আবেগময় মেলামেশার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সে ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। এআই হয়তো প্রেক্ষাপট বোঝার ভান করতে পারে। কিন্তু এর আউটপুট তৈরি হয় ডেটা প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে।
২০২৪ সালে ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ইন চায়নার সহযোগিতায় পরিচালিত একটি গবেষণায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এই গবেষণায় ২৩ জন শিক্ষা-প্রযুক্তি বিষয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। প্রথম দল পাঠ পরিকল্পনা তৈরির জন্য শুধু চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেয়। দ্বিতীয় দল সরাসরি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। ৮ সপ্তাহের এই গবেষণায় কিছু আকর্ষণীয় ফলাফল উঠে আসে। সেগুলোর মধ্যে ছিল—
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘কম্পিউটারস ইন হিউম্যান বিহেভিয়র’ এ শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানব শিক্ষকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আরেকটি বহুমাত্রিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এই গবেষণার মূল বিষয় ছিল অভিভাবক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মনস্তত্ত্ব বোঝা। গবেষক দলটি তিনটি ধাপে আচরণগত পরীক্ষা চালান। গবেষণায় তিনটি আচরণগত সমীক্ষার মাধ্যমে তিনটি প্রধান দিক উঠে আসে। সেগুলো হলো—
শুরুর সেই দ্বিধায় যদি আবার ফিরে যাই, সেই প্রশ্ন, মানুষ নাকি এআই—কে সেরা শিক্ষক? এর উত্তরটা বেশ জটিল। চ্যাটজিপিটি হয়তো সীমাহীন পাঠ পরিকল্পনা ও ধারণা তৈরি করতে পারে। কিন্তু তা বাস্তব শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করার ক্ষমতা তার নেই। এই দুই গবেষণার মূল বার্তা খুবই স্পষ্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাক্ষেত্রে গতি আনতে পারে, তথ্যের জোগান দিতে পারে এবং ব্যক্তিগত অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে। তবে মানুষের সহানুভূতি, শ্রেণিকক্ষের সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন এবং আবেগময় সম্পর্কের বিকল্প এআই হতে পারে না। তাই শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোনো একপক্ষের একক দখলে থাকবে না। সেরা শিক্ষক হবেন তিনিই, যিনি এআইকে নিজের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করবেন এবং নিজের মানবিক অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করবেন। মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সঠিক মেলবন্ধনই নিশ্চিত করবে আগামী দিনের আধুনিক ও সর্বাধুনিক শিক্ষা।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, সায়েন্স ডাইরেক্ট