মানুষ এখন পৃথিবী ছাড়িয়ে চাঁদ, চাঁদ ছাড়িয়ে মঙ্গল কিংবা অন্যান্য গ্রহেও উঁকি দেয়। কিন্তু অবাক করা তথ্য হলো, মহাকাশে মানুষের উপস্থিতির পথ সহজ করেছিল বেশ কিছু প্রাণী! পাঠ্যবই থেকে লাইকা নামের ছোট্ট রুশ কুকুরের কথা আমরা জানি। কিন্তু তথ্য বলছে, শুধু লাইকা নয়। তার আগে মহাকাশের পথে গিয়েছিল ফলের মাছি। তার পর বানর, আরও কুকুর, শিম্পাঞ্জি, একটি বিড়াল, কচ্ছপ, ইঁদুর ও মাকড়সা; এমনকি অণুবীক্ষণিক টার্ডিগ্রেড!
অবশ্য তারা কেউ মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। তাদের কেউ জানতও না যে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হয়েছে। এই প্রাণীগুলোর আচরণ, বেঁচে থাকা কিংবা হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানীরা খুঁজেছেন একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর—পৃথিবীর বাইরে জীবন কতটা টিকে থাকতে পারে?
ফলের মাছি! হ্যাঁ। ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভি-২ রকেটের মাধ্যমে ফলের মাছিকে পৃথিবীর প্রায় ১০৯ কিলোমিটার ওপরে পাঠায়। লক্ষ্য ছিল মহাকাশের বিকিরণ প্রাণীর ওপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলে, তা বোঝা।
ছোট্ট প্রাণীগুলোকে বহনকারী ক্যাপসুলটি প্যারাস্যুটের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরে আসে। আশার কথা, পরীক্ষায় ব্যবহৃত সব ফলের মাছি বেঁচে ছিল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপারে কী অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল এই অভিযানের মাধ্যমে। তার দুই বছর পর সেই পরীক্ষার পরিধি আরও বড় হয়।
১৯৪৯ সালে আলবার্ট-২ নামে একটি বানর মহাকাশে যাওয়া প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণীর মর্যাদা পায়। সেটিও বেঁচেই ফিরেছিল। কিন্তু পৃথিবীতে ফেরার সময় প্যারাস্যুটে ত্রুটি দেখা দিলে তার মৃত্যু হয়।
মহাকাশ গবেষণায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বেছে নিয়েছিল কুকুর। ১৯৫১ সালে সিগান ও দেজিক নামে দুটি কুকুর মহাকাশে গিয়ে নিরাপদে ফিরে আসে পৃথিবীতে। তারপর মহাকাশে যায় লাইকা। ১৯৫৭ সালে একে স্পুতনিক-২ মহাকাশযানে তুলে দেওয়া হয়। পৃথিবীর কক্ষপথে যাওয়া প্রথম প্রাণী ছিল লাইকা। তার যাত্রা ছিল ঐতিহাসিক কিন্তু একমুখী।
তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি তখনো তৈরি হয়নি। মহাকাশযানের ভেতরেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়।
১৯৬০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বেলকা ও স্ত্রেলকা নামে আরও দুটি কুকুরকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনে। কক্ষপথে যাত্রা করে পৃথিবীতে জীবিত ফিরে আসা প্রথম প্রাণী ছিল এই দুই কুকুর।
যৌথ অভিযান শেষ হলেও স্ত্রেলকার গল্প সেখানেই থামে থাকেনি। স্ত্রেলকা পরে কয়েকটি বাচ্চার জন্ম দেয়। তাদের একটি ছিল পুশিনকা। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ পুশিনকাকে উপহার হিসেবে তুলে দিয়েছিলেন ক্যারোলিন কেনেডির কাছে। ক্যারোলিন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির মেয়ে।
মহাকাশের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার থেকে শুরু হওয়া এক কুকুরের যাত্রা এভাবেই পৌঁছে গিয়েছিল দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের মানবিক গল্পে।
১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র গর্ডো নামে একটি কাঠবিড়ালি প্রজাতির বানরকে মহাকাশে পাঠায়।
উৎক্ষেপণ, ওজনহীনতা এবং পৃথিবীতে ফেরার ধাপ সফলভাবে পার করলেও প্যারাস্যুটে ত্রুটির কারণে গর্ডোর ক্যাপসুল আটলান্টিক মহাসাগরে হারিয়ে যায়।
পরের বছর মিস এবল ও মিস বেকার মহাকাশে গিয়ে জীবিত ফিরে আসে। মিস এবল অবশ্য ফিরে আসার চার দিন পর মারা যায়। কিন্তু বেকার বেঁচে ছিল ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। সে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার মার্কিন মহাকাশ ও রকেট কেন্দ্রে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিল। সেখানেই তার মৃত্যু হয় এবং তার সমাধিতে এখনো দর্শনার্থীরা কলা রেখে যায়। বেকারের দীর্ঘ জীবন মানুষের কাছে এক অন্য রকম স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
তার নাম ছিল হাম। মহাকাশযাত্রার আগে নির্দিষ্ট একটি লিভার পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল তাকে। বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন, মহাকাশে গিয়ে কোনো প্রাণী নির্দেশনা বুঝে নির্দিষ্ট কাজ করতে পারে কি না।
১৯৬১ সালের অভিযানে হাম মহাকাশে বেঁচে থাকার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ অনুযায়ী কাজও করতে পেরেছিল। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি সাফল্য। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পান, ওজনহীন অবস্থাতেও মহাকাশযানের যাত্রী নির্দেশনা বুঝে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
কয়েক মাস পর অ্যালান শেপার্ডের মহাকাশযাত্রার পথ সুগম করতে হামের অভিযান সহায়তা করে।
একই বছর এনোস নামে আরেকটি শিম্পাঞ্জি পৃথিবীর কক্ষপথে যায়। পৃথিবীর কক্ষপথে যাওয়া প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র শিম্পাঞ্জি এটি।
১৯৬৩ সালে মহাকাশ অভিযানে যোগ দেয় ফ্রান্স। তারাই প্রথম মহাকাশে পাঠায় ফেলিসেত নামের একটি কালো-সাদা বিড়ালকে। পৃথিবী থেকে মহাকাশে যাওয়া প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিড়াল ফেলিসেত। সে জীবিত ফিরে এসেছিল পৃথিবীতে। কিন্তু ফিরে আসার দুই মাস পর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য তাকে মেরে ফেলা হয়।
ফেলিসেত লাইকার মতো পরিচিত না হলেও মানুষের মহাকাশযাত্রার প্রাথমিক অধ্যায়ে তার উপস্থিতি ছিল অনন্য।
চাঁদের দেশে মানুষ যাওয়ার এক বছর আগে, ১৯৬৮ সালে দুটি কচ্ছপ চাঁদ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসেছিল পৃথিবীতে। সোভিয়েত চন্দ্রযান জোন্ড-৫-এ করে চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই কচ্ছপ দুটিই ছিল গভীর মহাকাশে ভ্রমণ করা এবং চাঁদ ঘুরে আসা পৃথিবীর প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ অভিযানে ফি, ফো, ফাম, ফুমি, ফু-সহ পাঁচটি ইঁদুরকে চাঁদের কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরের বছর স্কাই ল্যাব অভিযানে আরাবেলা ও আনিতা নামে দুটি মাকড়সা বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরে মহাকাশে প্রাণীর আচরণের আরেকটি বিস্ময়কর দিক। ওজনহীন অবস্থাতেও তারা জাল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় তাদের জাল তৈরির ধরন বদলে গিয়েছিল।
মাকড়সার সেই জালের ভেতর দিয়েও বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছিলেন মহাকাশে জীবনের আচরণ বদলে যাওয়ার একটি নতুন ছবি।
এরপর আসে এমন এক প্রাণীর গল্প, যার আকার এতই ছোট যে খালি চোখে তাকে প্রায় দেখাই যায় না। ২০০৭ সালে অণুবীক্ষণিক টার্ডিগ্রেড, যাদের জলভালুকও বলা হয়, মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মহাকাশেও তারা টিকে থাকতে সক্ষম হয়।
অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এই ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের সামনে প্রাণের সহনশীলতা নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করে।
মানুষ এখন মহাকাশে যায়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘদিন অবস্থান করে। মহাকাশে বসেই নানা ধরনের পরীক্ষা চালায়। তবু প্রাণীদের নিয়ে গবেষণার গল্প শেষ হয়নি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ইঁদুর, পোকামাকড়, সামুদ্রিক প্রাণীসহ বিভিন্ন প্রাণীকে বিশেষায়িত ছোট আবাসনে রাখা হয়। তাদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণা মূলত দীর্ঘমেয়াদি জৈব-চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষার অংশ।
তথ্য: নাসা: মহাকাশে প্রাণীদের ইতিহাস