আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা এবং অফিসের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার এখন খুব দ্রুত বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের অনেকের ধারণা, এআই হয়তো যেকোনো কঠিন বা অসম্ভব কাজ নিমেষে করে ফেলতে পারে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দুনিয়ায় এআই আসল ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা কতটুকু, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
কঠিন গণিত সমাধানে এআই আসলেই কতটা দক্ষ, তা যাচাই করার জন্য ফাস্ট প্রুফ নামের একটি বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। এই পরীক্ষার বিশেষত্ব ছিল এর প্রশ্নগুলো, যা আগে কখনো কোনো বই বা ইন্টারনেটে ছিল না। গণিতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ১০ জন গবেষক মিলে এমন ১০টি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছিলেন, যেগুলো তাঁরা নিজেদের গবেষণার সময় সমাধান করেছিলেন কিন্তু কোথাও প্রকাশ করেননি। ফলে এআইর পক্ষে আগে থেকে উত্তরগুলো মুখস্থ করে রাখা বা ডেটাবেইস থেকে বের করার কোনো সুযোগ ছিল না। এরপর উত্তরগুলো যাচাই করার জন্য অভিজ্ঞ গণিতবিদদের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য মডেলগুলোকে সবার সামনে উন্মুক্ত হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। একমাত্র বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই তাদের চ্যাটজিপিটি ৫.০ প্রো মডেল নিয়ে এতে অংশ নেয়। বাকি সিস্টেমগুলো তৈরি করেছিল লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি এবং জুরিখের সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও রুডের উন্মুক্ত সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে একটি বিশেষ কাঠামো তৈরি করেছিল, যা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে উত্তর যাচাই করতে পারত। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, জুরিখের ইটিএইচ দলের তৈরি মডেলটি সবচেয়ে ভালো করেছে এবং তারা ১০টির মধ্যে মাত্র ৬টি সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে। এই গবেষণার ফল থেকে পরিষ্কার যে মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় এআই সিস্টেমগুলো এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
অবশ্য এআইর সাম্প্রতিক সাফল্যও একেবারে কম নয়। এই পরীক্ষার কিছুদিন আগে ওপেনএআইর একটি চ্যাটবট প্রখ্যাত গণিতবিদ পল এরডসের দেওয়া ৮০ বছরের পুরোনো একটি কঠিন গণিত সমস্যার সমাধান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ফাস্ট প্রুফের মতো পরীক্ষাগুলো ভবিষ্যতে গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করবে, একজন দক্ষ সহকারী হিসেবে এআই ঠিক কতখানি ভরসাযোগ্য হতে পারে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, এই এআই কি কখনো মানুষের মতো অনুভূতিসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারবে?
বিশিষ্ট ব্রিটিশ পদার্থবিদ ও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ মনে করেন, মানুষের মন বা চেতনা কোনো সাধারণ কম্পিউটার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। চ্যাটজিপিটি বা রোবটগুলোকে যতই বুদ্ধিমান মনে হোক না কেন, এগুলো মূলত কোটি কোটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ (০ এবং ১)-এর বাইনারি হিসাব কষে কাজ করে, যা অনেকটা সাধারণ ক্যালকুলেটরের মতো। কিন্তু মানুষের মন কোনো যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর নয়। পেনরোজের মতে, আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে অতিক্ষুদ্র মাইক্রোটিউবুলসে এক জটিল কোয়ান্টাম গণনা চলে, যা কোনো যান্ত্রিক কম্পিউটার চাইলেও নকল করতে পারবে না। মানুষ যেভাবে হঠাৎ কোনো সুন্দর কবিতা লিখে ফেলে বা গভীর আবেগ অনুভব করে, তার পেছনে কাজ করে এই কোয়ান্টাম রহস্য।
বর্তমানে জটিল গণিত সমাধানের এই পরীক্ষায় কিছু ব্যর্থতা থাকলেও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো আরও উন্নত মানের এআই তৈরি করা সম্ভব হবে, যা আরও জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে। কিন্তু মানুষের মতো একজন অনুভূতিসম্পন্ন বন্ধু বা সহকারী হিসেবে গড়ে ওঠার এই প্রতিযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেষ পর্যন্ত মানুষের সমকক্ষ হতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।