শুরুতে ছন্নছাড়া রক্ষণ, একের পর এক নেপালি আক্রমণ আর ২৩ মিনিটে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়া—মারগাওয়ের জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধের গল্পটা বাংলাদেশের জন্য হতে পারত চরম হতাশার। কিন্তু ঋতুপর্ণা চাকমার জাদুকরী এক শটে পাশার দান উল্টে গেল চোখের পলকে। শুরুতে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে প্রথমার্ধ শেষ করেছে ১-১ সমতার স্বস্তি নিয়ে।
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই মারগাওয়ের মাঠে চেনা ছন্দে দেখা যায়নি মারিয়া মান্দাদের। রক্ষণভাগের একাদশে যেন কিছুটা জড়তা কাজ করছিল। ম্যাচের ৩ মিনিটেই রাশমি কুমারীর দুর্বল শট কোনোমতে ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক মিলি আক্তার। ৬ মিনিটে নেপালের চড়াও আক্রমণ এবং ৯ মিনিটে রেখা পৌডেলের গতিময় শট সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় বাংলাদেশকে। ১২ মিনিটের দিকে ছোট ছোট পাসে বাংলাদেশ কিছুটা গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও ম্যাচের ২৩ মিনিটে বড় ধাক্কাটি আসে। নেপালের দীপা শাহীর বাতাসে ভাসানো কর্নার কিক বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের এড়িয়ে সিক্স-ইয়ার্ড বক্সে পড়লে, নেপালি ডিফেন্ডার গীতা রানা এক ঝাঁক খেলোয়াড়ের মাথার ওপর দিয়ে আলতো টোকায় বল জালে জড়ান। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
পিছিয়ে পড়ার পর ৩৬ মিনিটে আরও এক গোল খেতে পারত বাংলাদেশ। নেপালের প্রীতি রাইয়ের দূরপাল্লার শট গোলরক্ষক মিলি আক্তারের মাথার ওপর দিয়ে জালের দিকে যাচ্ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে লাইন থেকে কিছুটা সামনে থাকা মিল দারুণ দক্ষতায় পেছনে গিয়ে বলে হাত ছোঁয়ান। বলটি ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে স্বস্তি পায় বাংলাদেশ। এর দুই মিনিট পর পেনাল্টির জোরালো আবেদন করেছিল নেপাল, তবে রেফারি তাতে সাড়া দেননি।
ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায় ৪০ মিনিটে। দলের আক্রমণভাগে ধার বাড়াতে এবং বিরতির আগেই সমতায় ফিরতে কোচ পিটার বাটলার এক সাহসী চাল চালেন। উমেহলা মারমা ও সৌরভী প্রীতিকে তুলে নিয়ে তিনি মাঠে নামান শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরাকে। এই জোড়া পরিবর্তন যেন পুরো বাংলাদেশ দলের শরীরী ভাষা বদলে দেয়। আক্রমণভাগে যোগ হয় নতুন গতি।
৪৪ মিনিটে উইং দিয়ে বল নিয়ে ঢোকার সময় ফাউলের শিকার হন ঋতুপর্ণা চাকমা। সেখান থেকে পাওয়া কর্নারই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে কর্নার কিক নিতে আসেন ঋতুপর্ণা। সবার ধারণা ছিল বক্সে ক্রস আসবে, কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে ঋতুপর্ণা সরাসরি শট নেন গোলপোস্ট লক্ষ্য করে। বাতাসে বাঁক খেয়ে বল সরাসরি নেপালের গোলপোস্টের কোণ দিয়ে জালে জড়ায়! ফুটবল পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘অলিম্পিক গোল’। সরাসরি কর্নার থেকে ঋতুপর্ণার এই অবিশ্বাস্য গোল স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়, সমতায় ফেরে বাংলাদেশ।
গোল হজম করে নেপাল যখন দিশেহারা, তখন প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে আবারও কাঁপন ধরিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা। ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে এক কঠিন কোণ থেকে জোরালো শট নিয়েছিলেন তিনি, তবে এবার নেপালি গোলরক্ষক আঞ্জিলা সুব্বা কোনোমতে কর্নার দিয়ে দলকে রক্ষা করেন। শুরুর ৪০ মিনিটের ব্যর্থতা ভুলে শেষ ১০ মিনিটের আগুনে ফুটবল খেলে বাংলাদেশ এখন চালকের আসনে। বিরতির পর এই ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ম্যাচ জয় অসম্ভব কিছু নয় মারিয়া মান্দাদের জন্য।