বাংলাদেশ সময় তখন সকাল। কিন্তু ৯ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকা বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে তখনো রাত। ভক্ত-সমর্থকদের মতো লিওনেল মেসিও খুব করে চাইছিলেন, যেন এই রাত শেষ না হয়। কিন্তু কখনো না কখনো থেমে যেতে হয়। আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই বেজে গেল আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির পথচলা।
যে দীর্ঘ ২১ বছর আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৮ ম্যাচ খেলেছেন, গড়েছেন অজস্র রেকর্ড, সেই জার্সি আর পরা হবে না মেসির। বিদায়ী ভাষণ দিতে গিয়ে যেন তাঁর গলাটা ধরে এল। অনেক কষ্টে আবেগ সামলেছেন। এই দিনে তাঁর মনে পড়ছে বাবাকে। প্রাণপ্রিয় বাবাকে হোর্হে মেসিকে হারিয়েছেন ৮ আগস্ট। কিন্তু মেসির কাছে হোর্হে তো কেবল বাবা ছিলেন না। ছিলেন তাঁর মেসি হয়ে ওঠার নেপথ্য নায়কও।
বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর আজ যখন মাইক্রোফোন হাতে মেসি কিছু একটা বলে উঠলেন, পুরো মনুমেন্তাল করতালিতে ফেটে পড়ল। আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার বলেন, ‘আজ কিছু বলা খুব কঠিন। মনের মধ্যে এত আবেগ কাজ করছে। প্রথমেই আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি—যেমনটা আমার বিদায়ী চিঠিতেও বলেছিলাম।’
২০১৪ সালে মারকানায় জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ জেতা হয়নি মেসির। পরবর্তীতে ২০১৫, ২০১৬ সালে টানা দুইবার কোপা আমেরিকায় হয়েছেন রানার্সআপ। এমনকি ২০১৬ সালে নিয়েছিলেন অবসরও। কিন্তু অবসর ভেঙে ফিরে যা করলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ জিতে মেসি তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্নপূরণ করেছেন। জিতেছেন ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২৪ কোপা আমেরিকাও।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২১ বছর খেলা মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন নিয়েও কথা বলেছেন। বিদায়ী ভাষণে আর্জেন্টাইন তারকা বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। আমরা যত কঠিন পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হয়েছি না কেন, সবচেয়ে খারাপ সময়েও আমি কখনো লড়াই করা থামাইনি। নিজের সর্বস্ব দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিনি।’
বিশ্বের যে মাঠেই মেসির ম্যাচ হোক না কেন, গ্যালারি হয়ে যায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ২০২২, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার তারকা ফরোয়ার্ডের আকাশী নীল রঙের ১০ নম্বর জার্সি পরে অনেক ভক্ত-সমর্থক খেলা দেখেছেন। আজ আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচে মনুমেন্তালের গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। ভক্ত-সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত মেসি বলেন, ‘এখানে খেলা আমি ভীষণ মিস করব। আমি সৌভাগ্যবান যে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছি। আর সবসময় মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। জীবনের প্রত্যেক অভিজ্ঞতার জন্য কৃতজ্ঞ।’
বিদায়ী ম্যাচে দলের তিনটি গোলেই অবদান রেখেছেন মেসি। নিকো পাস, নিকোলাস ওতামেন্দিকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করেন গোল। তাঁর বিদায়ী ভাষণ লিওনেল স্কালোনিসহ মনুমেন্তালের দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছেন। এনসো ফের্নান্দেসসহ কয়েক জন ফুটবলারের চোখে দেখা গেছে অশ্রু। আতশবাজি আর মেসিকে ঘিরে নাচানাচিতে হয়ে গেল তাঁর বিদায়।