কলম্বোর প্রেমাদাসা গতকাল যেন হয়ে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসান, তাওহীদ হৃদয়, নুরুল হাসান সোহান—বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মিলনমেলা তো হয়েছেই। গ্যালারিতে লাল-সবুজের পতাকা হাতে দর্শকদের দেখা গেছে। নুরুল হাসান সোহান তাতে ভীষণ খুশি। তাঁর মতে ক্রিকেটের প্রতি বাংলাদেশের দর্শকদের ভালোবাসা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
ফাইনালে জাফনা কিংসের বিপক্ষে গল গ্যালান্টসের একাদশে নুরুল হাসান সোহান ছিলেন না ঠিকই। কিন্তু যে গলের হয়ে খেলেছেন, সেই শিরোপাজয়ী দলের অংশীদার তো তিনিও। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গ্যালারিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকদের কাছে চলে যান সোহান। তখন দর্শকদের মোবাইল দিয়ে সোহানের ছবি তুলতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের তারকা অলরাউন্ডার নিজের টুপি দেন এক ভক্তকে।
শ্রীলঙ্কার মাঠে বাংলাদেশের দর্শকদের এমন উন্মাদনা আশাও করেননি সোহান। কলম্বোতে গত রাতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দেশের ভক্ত-সমর্থকদের ক্রিকেটপ্রেম নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের নিয়ে যদি বলা হয়, আমার কাছে মনে হয় সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা সেটা হলো ক্রিকেটের প্রতি আবেগ। তাদের যে ভালোবাসা, এটা আসলে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। আপনি যেখানেই যান না কেন, সব জায়গায় বাংলাদেশি দর্শক পাবেন। আজ (গতকাল) দেখলাম অনেক বাংলাদেশি দর্শক এখানে এসেছেন। যেটা আমিও অবাক হয়েছি।’
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ সফলতা এসেছে ২০২০ সালে। আকবর আলীর নেতৃত্বে সেবার ভারতকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। তবে জাতীয় দল কোনো মেজর শিরোপা জিততে পারেনি। ২০১২, ২০১৬, ২০১৮—তিনবার এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে প্রত্যেকবারই রানার্সআপ হয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি—আইসিসি ইভেন্টের কোনোটিতেই ফাইনালে উঠতে পারেননি এশিয়ার এই দল। প্রবাসে দর্শকদের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসায় মুগ্ধ সোহান বলেন, ‘বাংলাদেশিদের ক্রিকেটের প্রতি আলাদা ভালোবাসা আছে। আমরা যারা ক্রিকেট খেলছি, আমার কাছে মনে হয় যে এটা আমাদের দায়িত্ব কোনো একটা ট্রফি উপহার দেওয়া।’
এলপিএলে শ্রীলঙ্কার স্টেডিয়ামগুলোর গ্যালারিতে দেখা গিয়েছিল দর্শকখরা। তাতে করে ফাইনাল সামনে রেখে ফ্রি টিকিটের ব্যবস্থা করে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি)। জাফনা কিংস-গল গ্যালান্টস ফাইনালে গ্যালারিতে তাই দর্শকদের উন্মাদনা একটু বেশি দেখা গেছে। যদিও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ফাইনালে টিকিটের দাম ওঠে আকাশচুম্বী।
সোহান অবশ্য দুই দেশের টুর্নামেন্টের টিকিটের দাম নিয়ে অত ভাবছেন না। কীভাবে দেশের জনগণকে শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসানো যায়, সেটা নিয়েই ভাবছেন তিনি। গতকাল সংবাদমাধ্যমকে সোহান বলেন, ‘আমি যেটা বললাম, বাংলাদেশের দর্শকদের সঙ্গে আপনি অন্য কারো তুলনা করতে পারবেন না। তাদের ক্রিকেটের প্রতি যে ভালোবাসা এবং যে আবেগ, এটা আসলে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সেভাবে দেখিনি। ক্রিকেটের প্রতি তাদের যে প্যাশন, তার জন্য ক্রিকেটার হিসেবে আমাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। সে জায়গা থেকে আমার কাছে মনে হয় যে এরকম ট্রফি কোনো সময়... এটাই চিন্তা করছিলাম যদি কোনো সময় তাদের উপহার (শিরোপা) দিতে পারি, সেটা হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
একঝাঁক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে দেখা গেছে এবারের এলপিএলে। শ্রীলঙ্কার এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে সোহান খেলেছেন দুই ম্যাচ। একই দলে খেলেছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজও। এ ছাড়া কলম্বো ক্যাপসের হয়ে খেলেন হাসান মাহমুদ ও রিপন মন্ডল। ফাইনালের রানার্সআপ দল জাফনা কিংসে ছিলেন দুই বাংলাদেশি সাকিব আল হাসান ও তাওহীদ হৃদয়। যাঁদের মধ্যে হৃদয়ের পারফরম্যান্স আলাদা নজর কেড়েছে। পাঁচ ম্যাচে ৭৫.৫ গড় ও ১৯৮.৬৮ স্ট্রাইকরেটে করেন ১৫১ রান। মেরেছেন ৮ চার ও ১ ছক্কা।
টুর্নামেন্ট জুড়ে ছন্দে থাকা হৃদয় গতকাল ফাইনালেই শুধু ব্যর্থ হয়েছেন। করেছেন কেবল ১০ রান। হৃদয়ের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ সোহান বলেন, ‘যখন হৃদয় আউট হয়েছে, তখন ড্রেসিংরুমে আমরা বলছিলাম যে এটাই দলের অনেক বড় মোমেন্টাম। দলকে অনেক বেশি চাঙা করেছে। অবশ্যই সে পুরো টুর্নামেন্টে ভালো খেলছে। যেখানে খেলবে, যেদিন সে রান করবে, আমার কাছে মনে হয় তা পুরো দলের মোমেন্টাম বদলে দেয়।’
সোহান যেখানে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন, মুদ্রার উল্টো পিঠে অবস্থান করছেন তাঁর জাতীয় দলের দুই সতীর্থ সাকিব ও হৃদয়। জাফনার জার্সিতে গতকাল ফাইনালে সাকিবের ব্যাট থেকে এসেছে ৯ রান। তবে বোলিংয়ে ৪ ওভারে ১৫ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। ১৫ বল ডটও দিয়েছেন। একই দলের হৃদয় শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে করেন ১০ রান। টস জিতে আগে ব্যাটিং নিয়ে সাকিব-হৃদয়ের জাফনা ১৯.৩ ওভারে ১২৩ রানে গুটিয়ে যায়। ১২৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৫.৫ ওভারে ৫ উইকেটে গল করে ১২৬ রান।