এই ডারউইনেই ২০০৩ সালে তিন দিনে ইনিংসে হেরেছিল বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় ২৩ বছর পর পাল্টে গেছে অনেক কিছুই। বদলেছে বাংলাদেশও। নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এবার ডারউইনের ম্যারারা ওভালে ৯ উইকেটের দাপুটে জয় পেয়েছে। তাও দেড় দিন হাতে রেখে।
ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অজিদের বিপক্ষে ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণে এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের এই দুই জয় তো আছেই, এমনকি নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের দুটি জয়কেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি) নিজেদের সেরাদের তালিকায় রেখেছে। চলুন তাহলে দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের সেই চার ঐতিহাসিক জয়।
প্রতিপক্ষ: অস্ট্রেলিয়া; ভেন্যু: ডারউইন; ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী; ২০২৬
বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে যায়। সিরিজের প্রথম ম্যাচেই তারা নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় জয় তুলে নেয়। ৯ উইকেটে জিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় শান্তর দল।
হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায়। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করেন তিনি। এরপর বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে ২২৮ রানের বিশাল লিড নিয়েছে। তানজিদ হাসান তামিম করেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি (১০১ রান)। মেহেদী হাসান মিরাজ (৬৫) ও নাজমুল হোসেন শান্তর (৮৪) ব্যাট থেকেও আসে ফিফটি।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ। মিরাজ এবার নিয়েছেন ৫ উইকেট। হাসান মাহমুদ আরও ৩ উইকেট নিয়ে ৯ উইকেট পেয়েছেন। ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৮৬ বলেই জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ৯ উইকেটের জয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন হাসান।
প্রতিপক্ষ: পাকিস্তান; ভেন্যু: রাওয়ালপিন্ডি; ফল: বাংলাদেশ ১০ উইকেটে জয়ী; ২০২৪
২০২৪ সালে এই সিরিজেই পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের মাঠে প্রথমবারের মতো জয়ের কীর্তি গড়ে বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে ১০ উইকেটের জয় তো পেয়েছেই। সিরিজে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করে বাংলাদেশ।
সিরিজের প্রথম টেস্টে আগে ব্যাটিং করে সৌদ শাকিল (১৪১) ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের (১৭১*) সেঞ্চুরির ওপর ভর করে পাকিস্তান ৪৪৮ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে। তবে বিশাল এই সংগ্রহেও বাংলাদেশ বিচলিত হয়নি। ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় তারা।
মুশফিকুর রহিম দুর্দান্ত ১৯১ রানের ইনিংস খেলেন। সাদমান ইসলাম ৭ রানের জন্য সেঞ্চুরি করতে পারেননি (৯৩ রান)। মুমিনুল হক (৫০), লিটন দাস (৫৬) ও মেহেদী হাসান মিরাজের (৭৭) ব্যাট থেকেও আসে ফিফটি। ৫৬৫ রান করে বাংলাদেশ নেয় ১১৭ রানের লিড।
বাংলাদেশ এরপর দুর্দান্ত বোলিংয়ে পাকিস্তানকে ১৭৪ রানে গুটিয়ে দেয়। মিরাজ নেন ৪ উইকেট। সাকিব আল হাসান পান ৩ উইকেট। ৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ঐতিহাসিক ১০ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ।
প্রতিপক্ষ: নিউজিল্যান্ড; ভেন্যু: মাউন্ট মঙ্গানুই; ফল: বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী; ২০২২
২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় জয় তুলে নেয়। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে তৎকালীন আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রথমে ব্যাটিং করে নিউজিল্যান্ড ৩২৮ রান করে। বাংলাদেশ ৪৫৮ রান করে ১৩০ রানের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ইনিংস লিড নেয়। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের বোলাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ইবাদত হোসেন চৌধুরী ৪৬ রানে নেন ৬ উইকেট। নিউজিল্যান্ড ১৬৯ রানে গুটিয়ে গেলে বাংলাদেশ পায় কেবল ৪০ রানের লক্ষ্য। ১৬.৫ ওভারে ২ উইকেটে ৪২ রান করে নিউজিল্যান্ডের মাঠে প্রথম টেস্ট জয়ের কীর্তি গড়ে বাংলাদেশ। ৮ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন ইবাদত। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২১ রানে পেয়েছেন ৭ উইকেট।
প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া; ভেন্যু: মিরপুর; ফল: বাংলাদেশ ২০ রানে জয়ী; সাল ২০১৭
২০১৭ সালে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম টেস্ট জয় অর্জন করে। মিরপুরের ঘূর্ণি সহায়ক উইকেটে তারা ২০ রানের স্মরণীয় জয় তুলে নেয়।
প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বিপাকে পড়লেও বাংলাদেশ করেছে ২৬০ রান। সাকিব আল হাসানের ব্যাট থেকে আসে ইনিংসে সর্বোচ্চ ৮৪ রান। তামিম ইকবাল করেন ৭১ রান। জবাবে অস্ট্রেলিয়া লড়াই করলেও ২১৭ রানে অলআউট হয়ে যায়। সাকিব তাঁর ঘূর্ণিজাদুতে নিয়েছেন ৫ উইকেট।
দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম করেন ৭৮ রান করেন। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম করেন ৪১ রান। বাংলাদেশ ২২১ রান করে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ২৬৫ রানের লক্ষ্য দাঁড় করায়। ডেভিড ওয়ার্নারের সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের আশা জিইয়ে রাখলেও বাংলাদেশের স্পিনাররা আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।
সাকিব আরও একবার ৫ উইকেট নিয়েছেন। মেহেদী হাসান মিরাজ ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচে নিয়েছেন ৫ উইকেট। তাইজুল ইসলাম ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে তাঁর চতুর্থ উইকেট তুলে নেন। বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণে অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে যায় ২৪৪ রানে। ২০ রানের রুদ্ধশ্বাস জয়ে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরা হয়েছেন সাকিব। ব্যাটিংয়ে ৮৯ রানের পাশাপাশি বোলিংয়ে নিয়েছেন ১০ উইকেট।