মোহাম্মদ মিঠুনের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় যখন কথা হলো, তখন তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, দক্ষিণ আফ্রিকাগামী ফ্লাইট ধরার অপেক্ষায়। বাংলাদেশ ‘এ’ ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়েছেন মিঠুন। ‘এ’ দলে তাঁর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। জাতীয় দলে কতবার সুযোগ পেয়েছেন, বাদ পড়েছেন—তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হলেও এত আলোচনা হয়নি তাঁকে নিয়ে।
মিঠুনকে নিয়ে কেন এখন এত আলোচনা? প্রশ্নটা শুনে হাসলেন তিনি। মিঠুন বললেন, ‘আপনিও জানেন, আমিও জানি। কারণ তো আর বলার দরকার নেই। আমি কিছু না বললেও আপনি কারণটা নিয়ে লিখতে পারবেন।’ ২০২১ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ৩৫ বছর বয়সী মিঠুনকে যে ‘এ’ দলে ফেরানো হবে, এমন একটা আলোচনা কদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল। নির্বাচক প্যানেল সূত্রেও জানা গেল, মিঠুনের অন্তর্ভুক্তি করার সময় তাঁদের মনে হয়েছে, এটা নিয়ে কথা উঠবে। তবু মিঠুনকে দলে নেওয়ার যুক্তি হিসেবে জাতীয় দলের পুল বড় করার বিষয়টি সামনে এনেছে নির্বাচক প্যানেল।
মিঠুন ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের বর্তমান সভাপতি। বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবেও একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। মিঠুনের ‘এ’ দলে অন্তর্ভুক্তি তাতে আরও বেশি সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। মিঠুন নিজেও মনে করেন, কোয়াবের সভাপতি না হলে ‘এ’ দলে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এত কথা হতো না, ‘পদটাই বিষয় দাঁড়িয়েছে। পদ নিয়ে যদি কাজ না করে বসে থাকতাম চুপচাপ, কিছুই হতো না। আমি আমার কাজ করছি।’
গত কদিনে মিঠুনের নেতৃত্বাধীন কোয়াব আরও একটি কারণে আলোচনায়। আর্থিক ক্ষতি এবং সংস্কারের কারণ দেখিয়ে এ বছর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তামিমের নেতৃত্বাধীন বিসিবির বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা। সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর অংশীজনদের সঙ্গে বসেছেন তামিমরা। যে তামিম খেলোয়াড়দের রুটিরুজির কথা চিন্তা করে দুই বছর আগে ফারুক আহমেদের বোর্ডের ওপর চাপ তৈরি করেছিলেন বিপিএল আয়োজন করতে, এমনকি সর্বশেষ বিপিএলের সময়েও বিভিন্ন উপায় বাতলে দিয়েছিলেন বিতর্কিত টুর্নামেন্টটির গুণগত মান উন্নয়নের। সেই তামিম বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর হাতে যথেষ্ট সময় পেলেও বিপিএল আয়োজন থেকে বিরত থাকছেন বলেই এত আলোচনা।
বিপিএলের যে মান, বছরের পর বছর যত বিতর্ক তৈরি হয়, তাতে টুর্নামেন্টটির সংস্কার অবশ্যই দরকার। কিন্তু বন্ধ করে কেন? সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এই প্রশ্ন সামনে এনেছেন। অতীতে সংস্কারের অজুহাতে দুবার বিপিএল বন্ধ রেখেও যে তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি, তা তো দেখাই গেছে। এবারও বিপিএলের সংস্কারের কথা বলা হলেও এখানে আসলে আর্থিক বিষয়টি অনেক বড়। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজি ও পৃষ্ঠপোষকদের বিনিয়োগ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সূত্রে জানা যায়, বিপিএলের অনেক সফল ফ্র্যাঞ্চাইজিরই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্রিকেটে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে যথেষ্ট অনীহা আছে। সঙ্গে আরও কিছু বিষয় জড়িয়ে।
এমন পরিস্থিতিতে বিপিএল বন্ধ রাখাই শ্রেয় মনে করছে বিসিবি। ক্রিকেটাররা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন। বিকল্প হিসেবে নিজেদের কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরেছেন। বিসিবি আয়োজিত ঘরোয়া ক্রিকেটের পারিশ্রমিক, ম্যাচ ফি, দৈনিক ভাতা, যাতায়াত ভাতাসহ আর্থিক বিষয়গুলো আকর্ষণীয় করার প্রস্তাব তাঁদের। এক বছরের বিপিএল আয়োজনের চেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ক্রিকেটারদের জীবনমানের উন্নয়নের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তামিম যদি বোর্ড সভাপতি না থাকতেন, তাহলে মিঠুনের নেতৃত্বাধীন কোয়াব কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত এত সহজে মেনে নিত?
মিঠুন বললেন, ‘বিপিএল হচ্ছে না। এটাতে যে প্লেয়াররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা তো একবারও অস্বীকার করা হয়নি। আমরা বৃহত্তর স্বার্থে যে কাজটা করছি, তাতে ১৫০ থেকে ২০০ প্লেয়ারের লাইফ সিকিউর হয়ে গেছে। এখন সংস্কারে এক বছর বন্ধ থাকল। সেই সংস্কারের পর যদি ১০-১৫ বছর একেবারে ভালোভাবে চলে, ওটাই হচ্ছে সাফল্য।’
গত পরশু ফিক্সিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত তিনজনের নাম প্রকাশ করেছে বিসিবি। তাঁদের সাময়িক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে বিপিএলের দ্বাদশ আসরে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে চার ব্যক্তিকে সাময়িক নিষিদ্ধ করে বিসিবি। তাঁদের মধ্যে একজনই ক্রিকেটার—অমিত মজুমদার। গত চার মাসে দুই ধাপে সাতজনের নাম প্রকাশিত হলেও আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের ‘রেড ফ্ল্যাগ’ধারী সেই ৯ ক্রিকেটারের ব্যাপারে বিসিবি এখনো কিছু স্পষ্ট করেনি, যাঁরা গত নিলামে অংশ নিতে পারেননি। বিপিএলের ফিক্সিংয়ের বিষবাষ্প দমন ভালোভাবেই হচ্ছে, নাকি এখানেও রাজনৈতিক খেলা; সেটা নিয়ে তাই সংশয় থেকেই যাচ্ছে।