‘হচ্ছে না ভাই, ডাইজেস্ট হচ্ছে না, কী দেখলাম।’ সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা ভুল লেখেননি। ডারউইনে কী করে দেখাল বাংলাদেশ! টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অজিদের হারানোর পর শুধু মাশরাফির পোস্ট থেকে ধার করে কিশোর কুমারের কালজয়ী গানের কথাটাই বলতে ইচ্ছা করছে, ‘আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো’।
বাংলাদেশ ক্রিকেট কখনো বড় কোনো বৈশ্বিক শিরোপা জয়ের (২০২০ যুব বিশ্বকাপটা বাদে) স্বাদ পায়নি। বৈশ্বিক ট্রফির হাহাকার বাদ দিলে বাংলাদেশ তাদের সর্বোচ্চ সাফল্যের দেখা পেল ডারউইনে। টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে পূর্ণ শক্তির অজিদের হারানো কতটা কঠিন, সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের কাছেই শুনতে পারেন। সেখানে বাংলাদেশ কত বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে, তা বোঝা গেল ক্রিকেট বিশ্বের প্রতিক্রিয়ায়। অবিরত অভিনন্দন আর শুভেচ্ছায় সিক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ দল। মাঠেই ধারাভাষ্যকার হিসেবে বাংলাদেশের এই পারফরম্যান্সের সাক্ষী হলেন রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, মার্ক ওয়াহ, ডেভিড ওয়ার্নার, জেসন গিলেস্পি, মার্ভ হিউজের মতো কিংবদন্তিরা। তাঁরাও বাংলাদেশকে ভাসালেন স্তুতিতে। আহ, এ যেন পরাবাস্তব দৃশ্য!
এ জয়ে অস্ট্রেলিয়ার দম্ভও যেন কিছুটা চূর্ণ করে দিল বাংলাদেশ। সেই ২০০৩ সালের পর বাংলাদেশকে আতিথ্য দিতে ২৩ বছর সময় নিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। খেলাও দিয়েছে তাদের ‘অফ পিক’ টাইমে, কম পরিচিত ভেন্যুতে। শুধু অজিরা কেন, বাংলাদেশেরও বেশির ভাগ দর্শকই ধরে নিয়েছিল, এই টেস্ট ৩ দিনও গড়াবে না! চতুর্থ দিনে তাই গ্যালারিতে স্বাগতিক দর্শকদের সংখ্যাও তেমন বেশি দেখা গেল না।
বিখ্যাত ভেন্যুতে না খেলতে পেরে যেন ‘সুবিধা’ই হয়েছে বাংলাদেশের। ডারউইনে নিয়মিত না খেলায় অস্ট্রেলিয়া যে নিজেদেরই পিচ, মাঠ ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি, সে তো বোঝাই গেল। ম্যাচের পর প্যাট কামিন্সও স্বীকার করে নিয়েছেন, টেস্টটা তাঁরা হেরে গেছেন প্রথম দিনেই। সেখানে বাংলাদেশ স্বাগতিকদেরও অনেক আগে ডারউইনে গিয়ে নিজেদের প্রস্তুতির চূড়ান্ত করেছে। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার ঘটনাটা যেন স্টার্ক-কামিন্সদের ভুল বার্তা দিয়েছে! বাংলাদেশকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার ভুল আত্মবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে।
ডারউইন টেস্ট আন্ডারডগ হয়ে খেলতে নেমে তাই প্রতিটি সেশনে বাংলাদেশ এত দাপুটে ক্রিকেট খেলেছে, এই টেস্ট জয় বাংলাদেশের পাওনা হয়ে গিয়েছিল।
ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশ যেখানে অভিনন্দন-বৃষ্টিতে ভিজছে, অস্ট্রেলিয়া তখন তাদের দর্শক, পণ্ডিতদের কাছে তুমুল সমালোচিত। এরপর টেস্টে বাংলাদেশকে আতিথেয়তা দিতে অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই ২৩ বছর সময় নেবে না!
৩-৪ বছর ধরে বিদেশের মাঠে টেস্ট বাংলাদেশ চমকে দেওয়া জয় পাচ্ছে। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে টেস্ট জিতলেও অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অজিদের হারানো নিঃসন্দেহে সবচেয়ে স্মরণীয়। বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নিজেই বলেছেন, যেকোনো সংস্করণে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।
আর সেই জয় যেদিনে এসেছে, সেটা মনের খাতায় তো লিখে রাখতেই হবে।