হোম > বিজ্ঞান > গবেষণা

মানব মস্তিষ্কের টিস্যু বেড়ে উঠল ইঁদুরের মস্তিষ্কে, তৈরি করল স্নায়বিক সংযোগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

উপর থেকে দেখা একটি জেনোকর্টিক্যাল ইঁদুরের মস্তিষ্ক, যেখানে সবুজ ও লাল রঙে চিহ্নিত প্রতিস্থাপিত মানুষের মস্তিষ্কের কর্টিকাল অর্গানয়েড দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

মানব মস্তিষ্ক বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, মস্তিষ্কের ভেতরেই একজন ‘মানুষের’ টিকে থাকা। কারণ মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় তার মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন না। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, কীভাবে এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয় এবং কোন প্রক্রিয়ায় এসব ব্যবস্থা ভুল পথে যায়, তার অনেক কিছুই এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট নয়।

বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে নানা বিকল্প পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষাগারে কোষ তৈরি করা এবং ‘অর্গানয়েড’ নামে পরিচিত ছোট ত্রিমাত্রিক মস্তিষ্কের টিস্যু তৈরি করা। তবে সবচেয়ে উন্নত অর্গানয়েডেরও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে এমন একটি পুরো শরীর থাকে না, যাকে স্বাভাবিক অবস্থায় মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করে।

এবার সেই সমস্যার সমাধানের দিকে বড় ধরনের অগ্রগতি লাভ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। তাঁরা কিছু ইঁদুরের শরীরের মধ্যে মানব মস্তিষ্কের কর্টেক্স বা সেরিব্রাল কর্টেক্সের টিস্যু তৈরি করেছেন। এসব ইঁদুরের ক্ষেত্রে নিজস্ব সেরিব্রাল কর্টেক্সের বড় একটি অংশ বিকাশের একেবারে শুরুর দিকে জিনগতভাবে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।

মাত্র তিন মাসের মধ্যে ইঁদুরের কর্টেক্সের মোট টিস্যুর আয়তনের ৯০ শতাংশের বেশি মানব টিস্যুতে পরিণত হয়। এই সময়ের মধ্যে মানব টিস্যুর ভেতর রক্তনালি তৈরি হয়, এটি ইঁদুরের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কিছু স্নায়ু-প্রক্ষেপণ মেরুদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

স্ট্যানফোর্ডের স্নায়ুবিজ্ঞানী সার্জিউ পাশকা বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো এখনো ইঁদুর।’ তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী সায়েন্সঅ্যালার্টকে বলেন, ‘তাদের স্নায়ুতন্ত্র ইঁদুরের, সংবেদনশীল অঙ্গ ইঁদুরের এবং মস্তিষ্কের সাবকর্টিক্যাল কাঠামোও ইঁদুরের। অস্বাভাবিক বিষয় হলো—এসব প্রাণীর শরীরে থাকা কর্টিক্যাল টিস্যুর বেশির ভাগই মানব উৎস থেকে এসেছে এবং মানব নিউরনগুলো বেড়ে উঠেছে, একীভূত হয়েছে এবং ইঁদুরের বাকি স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করেছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্তিষ্কের অর্গানয়েড অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মস্তিষ্কের এমন টিস্যুর ছোট ছোট কাঠামো তৈরি করতে পারেন, যেখানে বিকাশমান মানব স্নায়ুতন্ত্রে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের কোষের বড় একটি অংশ থাকে। এমনকি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী অর্গানয়েডকে একসঙ্গে যুক্ত করে আরও জটিল কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘অ্যাসেমব্লয়েড।’

তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা একটি অর্গানয়েডের নিজস্ব রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা থাকে না, প্রক্রিয়াজাত করার মতো কোনো সংবেদনশীল তথ্য থাকে না এবং নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো পেশিও থাকে না। এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা পাশকা ও তার সহকর্মীরা বহু বছর ধরে করছেন। ২০২২ সালে তারা নবজাতক ইঁদুরজাতীয় প্রাণী, অর্থাৎ ইঁদুরের বদলে নবজাতক ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব কর্টিক্যাল অর্গানয়েড প্রতিস্থাপন করেন। সেখানে মানব নিউরন পরিণত হয়েছিল, ইঁদুরের মস্তিষ্কের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল এবং এমনকি ইঁদুরের গোঁফ থেকে আসা সংবেদনশীল তথ্যের প্রতিও সাড়া দিয়েছিল।

তবে তখনও একটি সমস্যা ছিল। মানব নিউরন রডেন্ট বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর নিউরনের তুলনায় অনেক ধীরে বিকশিত হয়। ফলে দুটি বিকাশমান ব্যবস্থা একই জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করছিল। তাই এবার গবেষকেরা প্রতিযোগিতাটাই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইঁদুরের মস্তিষ্কে জায়গা তৈরি

এ জন্য গবেষকেরা জিনগতভাবে এমন ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং হিপ্পোক্যাম্পাসের বড় অংশ কখনোই বিকশিত হয়নি। তারা এসব প্রাণীর নাম দেন ‘অ্যাপ্যালিয়াল’ ইঁদুর। কিছু ইঁদুরকে এভাবেই প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত বড় করা হয়। আর কিছু ইঁদুর জন্মের অল্প সময় পর মানব কর্টিক্যাল অর্গানয়েড প্রতিস্থাপন করা হয়। এই ইঁদুরগুলোকেই গবেষকেরা ‘জেনোকর্টিক্যাল’ ইঁদুর নামে অভিহিত করেন।

পরবর্তী কয়েক মাসে ইঁদুরগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিস্থাপিত মানব টিস্যুও তাদের সঙ্গে বেড়ে ওঠে। খালি পড়ে থাকা কর্টিক্যাল জায়গাজুড়ে টিস্যুটি দ্রুত বিস্তৃত হয়। তবে এর ফলে যে টিস্যু তৈরি হয়, সেটি কোনোভাবেই মানুষের পরিণত কর্টেক্সের হুবহু অনুলিপি ছিল না। প্রায় ছয় মাস পরও টিস্যুটি বিকাশের দিক থেকে অপরিণত ছিল। এর বিকাশমান অবস্থা মোটামুটি গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ের মানব কর্টেক্সের সঙ্গে তুলনীয় ছিল। একটি পরিণত কর্টেক্সে যে সুসংগঠিত স্তরগুলো থাকে, এই টিস্যুতে সেগুলোও ছিল না।

তারপরও এই মডেলে এমন কিছু নিউরন তৈরি হতে শুরু করে, যেগুলো অন্য মডেলে তৈরি করা নিয়ে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় পড়ছিলেন। এর মধ্যে ছিল ‘লেয়ার ৫ এক্সট্রাটেলেনসেফালিক’ বা এল৫–ইটি (L5-ET) নিউরন। এগুলো হলো দীর্ঘপথে সংকেত পাঠানো নিউরন, যা সাধারণত কর্টেক্সকে স্নায়ুতন্ত্রের দূরবর্তী অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এই নিউরনগুলোর মধ্যেই গবেষকেরা এমন কিছু কোষ খুঁজে পান, যেগুলো ‘ভন ইকোনোমো নিউরন’ বা ভিইএন (VEN)-এর মতো। এগুলো মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে পাওয়া অস্বাভাবিক ও লম্বাটে আকৃতির নিউরন। পরীক্ষাগারে এসব নিউরন তৈরি করা বিশেষভাবে কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের গবেষণায় এই ধরনের নিউরন পাওয়া যায়নি।

ইঁদুরের মস্তিষ্ক কীভাবে মানব নিউরনকে বিকশিত হতে সাহায্য করল?

এখন প্রশ্ন হলো, ইঁদুরের মস্তিষ্কের এমন কী আছে, যা এই মানব নিউরনগুলোকে বিকশিত হতে উৎসাহিত করে? পাশকা বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না। আর আমি মনে করি, গবেষণাটি যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, এটি তার একটি।’ তাঁর মতে, মানুষের কর্টিক্যাল নিউরনগুলোকে স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশে থাকা দূরবর্তী লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়ার ফলে এমন কিছু সংকেত পাওয়া সম্ভব, যা একটি পেট্রিডিশে অর্গানয়েডে তৈরি করা কঠিন।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, জীবন্ত শরীরের এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা পেট্রিডিশে থাকা অর্গানয়েডে নেই। এসব উপাদানের মধ্যে থাকতে পারে ট্রফিক বা বৃদ্ধিসহায়ক উপাদান, নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকেত, রক্তনালি তৈরি হওয়া অথবা আশপাশের কোষগুলোর সঙ্গে অন্যান্য ধরনের মিথস্ক্রিয়া।

মানব মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতরে কী ঘটছে, সেটি জানা ছিল গবেষণার একটি অংশ। অন্য অংশটি ছিল, এই মানব টিস্যু ইঁদুরের ওপর কী প্রভাব ফেলছে? এটি জানতে গবেষকেরা তিন ধরনের ইঁদুরকে ওয়াই (Y) আকৃতির গোলকধাঁধার পরীক্ষায় অংশ নেন। তিন দলের মধ্যে ছিল স্বাভাবিক, জিনগতভাবে পরিবর্তন না করা নিয়ন্ত্রণ ইঁদুর; অর্গানয়েড প্রতিস্থাপন না করা অ্যাপ্যালিয়াল ইঁদুর; এবং জেনোকর্টিক্যাল ইঁদুর।

ইঁদুর স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি গোলকধাঁধার বাহুতে যেতে পছন্দ করে, যেটিতে সে একটু আগে যায়নি। ফলে সে এর আগে কোন বাহুতে গিয়েছিল তা মনে রাখতে পারছে কি না, সেটি কাজের স্মৃতি বা ‘ওয়ার্কিং মেমোরি’ পরীক্ষা করার একটি সহজ উপায়। নিয়ন্ত্রণ ইঁদুরগুলো সম্ভাবনার চেয়ে ভালো ফল করে। কিন্তু অ্যাপ্যালিয়াল ইঁদুরগুলো তা করতে পারেনি। এর অর্থ হলো, তাদের কর্টেক্স ও হিপোক্যাম্পাসের বড় অংশ না থাকায় তারা একটু আগে কোন বাহুতে গিয়েছিল, সেটি মনে রাখতে সমস্যায় পড়েছিল।

অন্যদিকে জেনোকর্টিক্যাল ইঁদুরগুলো সম্ভাবনার চেয়ে ভালো ফল করে। পাশকা বলেন, ‘এটি একটি আকর্ষণীয় ফলাফল, বিশেষ করে কারণ অ্যাপ্যালিয়াল ইঁদুরগুলো একই ধরনের ফল দেখায়নি। তবে শুধু এই ফলাফল দেখে মানব নিউরন সরাসরি ওই আচরণের জন্য দায়ী, এমন সিদ্ধান্তে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।’

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা প্রয়োজন হবে।

মস্তিষ্কের রোগ বোঝার নতুন মডেল

এই মুহূর্তে গবেষণাটি যে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেটি হলো, ‘মানব মস্তিষ্কের কোষ কি ইঁদুরকে গোলকধাঁধায় আরও ভালো করতে পারে?’ এমন প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্নটি ছিল, ‘ইঁদুরের শরীরে মানব মস্তিষ্কের টিস্যু প্রতিস্থাপন করলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে কী ঘটে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রম ভুল পথে গেলে কী ঘটে, তা বোঝার জন্য একটি নতুন মডেল তৈরি করা সম্ভব কি না?’

এই পদ্ধতির বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবহার থাকতে পারে। পাশকা বলেন, এর একটি সুস্পষ্ট সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া। যেহেতু এই পদ্ধতিতে এখন ভিইএন-এর মতো নিউরন তৈরি করা সম্ভব, তাই রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া কোষ ব্যবহার করে কর্টিক্যাল অর্গানয়েড তৈরি করা যেতে পারে। এরপর গবেষকেরা দেখতে পারবেন, এই বিরল নিউরনগুলো রোগে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা এগুলোকে রক্ষা করতে পারে কি না।

এপিলেপসির ক্ষেত্রে গবেষকেরা জানতে পারবেন, রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত মানব নিউরনগুলো অস্বাভাবিক সার্কিট কার্যকলাপ বা খিঁচুনি তৈরি করে কি না এবং চিকিৎসার মাধ্যমে সেই অস্বাভাবিকতা ঠিক করা সম্ভব কি না। অটিজম এবং অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল বা স্নায়ুবিক বিকাশজনিত রোগের ক্ষেত্রে গবেষকেরা দেখতে পারবেন, মানব কর্টিক্যাল সার্কিটে নির্দিষ্ট পরিবর্তন প্রাণীর শরীরে পুনরাবৃত্তিযোগ্য কার্যকরী বা আচরণগত পরিবর্তন তৈরি করে কি না।