ইলন মাস্কের রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সের একটি নিয়ন্ত্রণহীন রকেটের বিশাল অংশ তীব্র গতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ এবং বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার কেজি (৪ টন) ওজনের এবং পাঁচতলা ভবনের সমান দৈর্ঘ্যের এই রকেটের অংশটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার (ঘণ্টায় প্রায় ৫,৪০০ মাইল) গতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে।
সংঘর্ষে লিপ্ত অংশটি স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটের ওপরের অংশ। গত বছর একটি আন্তর্জাতিক চন্দ্রাভিযানের অংশ হিসেবে দুই চন্দ্রযান ও গবেষণার সরঞ্জাম মহাকাশে পাঠাতে রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। মূল কাজ শেষ হওয়ার পর এর পুনঃব্যবহারযোগ্য অংশ পৃথিবীতে ফিরে এলেও উপরিভাগটি মহাকাশেই রয়ে যায়।
১৮ মাস ধরে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে রকেটের এই পরিত্যক্ত অংশটি নিজের কক্ষপথ থেকে কিছুটা সরে যায় এবং ধীরে ধীরে চাঁদের অভিমুখে ধাবিত হতে থাকে।
নাসার মুখপাত্র জিমি রাসেল জানান, এই সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীর জন্য বা মানবজাতির জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ম্যাট বোথওয়েল বিবিসিকে বলেন, ‘এটি চাঁদের বুকে বিশাল এক সংঘর্ষের ঘটনা। তবে এটি পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর নয়। উল্টো বিজ্ঞানীদের জন্য এটি একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।’
খালি চোখে পৃথিবী থেকে এই সংঘর্ষ দেখা না গেলেও বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধূলিঝড় ও আলোর ঝলকানির তথ্য সংগ্রহ করছেন।
এই সংঘর্ষের ফলে চাঁদের ‘আইনস্টাইন ক্রেটার’-এর কাছে একটি নতুন গর্ত বা ক্রেটার তৈরি হয়েছে। নাসার ‘লুনার রিকনসেন্স অর্বিটার’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দানুরি’ মহাকাশযান আঘাতের স্থানের আগে ও পরের ছবি তুলে বিশ্লেষণ করবে। শিগগিরই এই ছবিগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামের মহাকাশ প্রধান লিবি জ্যাকসন বলেন, ‘উল্কাপাতের ওজন বা গতি আমরা আগে থেকে জানতে পারি না। কিন্তু এবার আমরা রকেটের ভর ও গতি আগেই জানতাম। ফলে চাঁদের গঠন ও এর মাটির উপাদান নিয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন তথ্য উঠে আসবে।’
বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই সংঘর্ষের পর চাঁদে মানুষের তৈরি বস্তুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজারটিতে, যার মোট ওজন আনুমানিক ১৯০ টন। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘লুনা ২’ প্রথম চাঁদে আঘাত করার পর থেকে বিভিন্ন অভিযানের কারণে মানবসৃষ্ট যন্ত্রাংশ জমা হয়ে আসছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দিনে চাঁদে অভিযান ও কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা আরও বাড়বে। ফলে কক্ষপথে জমা হতে থাকা এই ‘মহাকাশ বর্জ্য’ ভবিষ্যতে নতুন চন্দ্রাভিযান ও কৃত্রিম উপগ্রহের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।