পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো প্রাণের অস্তিত্বের এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছেন এবং মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই একা নই, এমন কোনো ইঙ্গিতের জন্য সংকেতও শুনে চলেছেন। এবার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের একটি গবেষক দল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম সাফল্যের ঘোষণা দিয়েছে—একটি এক্সোপ্ল্যানেট (সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ) থেকে সরাসরি আসা একটি রেডিও সংকেত শনাক্ত করা হয়েছে।
এর আগে, গ্রহ থাকা বিভিন্ন নক্ষত্রব্যবস্থা থেকে রেডিও সংকেত শনাক্ত করা হলেও, সেগুলো যে প্রদক্ষিণরত গ্রহ থেকেই এসেছে, নাকি গ্রহটির চারপাশের নক্ষত্র থেকে এসেছে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এবারও বিষয়টি কোনোভাবেই এলিয়েনদের যোগাযোগের চেষ্টা নয়।
সংকেতটি আসছে এক্সোপ্ল্যানেটটির অরোরা বা মেরুজ্যোতি থেকে। চার্জযুক্ত কণাগুলো যখন গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্রের বিভিন্ন অবস্থার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন শক্তি নির্গত হয় এবং এর ফলে অরোরা তৈরি হয়। পৃথিবীতেও অরোরা দেখা যায়, যা উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর আলো হিসেবে পরিচিত।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘যদিও সৌরজগতের গ্রহগুলো এবং কিছু অতি-শীতল বামন নক্ষত্রে অরোরাজনিত রেডিও বিস্ফোরণ দেখা যায়, কিন্তু এর আগে কোনো রেডিও সংকেতকে তার নক্ষত্রের পরিবর্তে কোনো অতিরিক্ত-সৌরজাগতিক গ্রহের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা দশমিক ৮৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে দ্রুত, পুনরাবৃত্ত এবং অত্যন্ত বৃত্তাকারভাবে পোলারাইজড বিস্ফোরণ, পাশাপাশি স্থায়ী নির্গমনও শনাক্ত করেছি।’
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে ব্যবহার করে গবেষকেরা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চারটি পৃথক সময়ে এই ফ্রিকোয়েন্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। টেলিস্কোপ অ্যারের মূল লক্ষ্য ছিল বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্রটি, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই নক্ষত্রকে ঘিরে তিনটি পরিচিত গ্রহ রয়েছে—বেটা পিক্টোরিস বি, বেটা পিক্টোরিস সি এবং বেটা পিক্টোরিস ডি।
পর্যবেক্ষণে যে সংকেত পাওয়া যায়, সেগুলো ছিল ছোট, বারবার ফিরে আসা রেডিও তরঙ্গের বিস্ফোরণ। রেডিও তরঙ্গগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে বৃত্তাকারভাবে পোলারাইজড। অরোরা থেকে নির্গত সংকেতের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রচলিত বৈশিষ্ট্য। আকাশের মানচিত্রে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে অত্যন্ত উজ্জ্বল গ্যালাক্সির কেন্দ্র, অর্থাৎ কোয়াসার ব্যবহার করে গবেষকেরা উচ্চমাত্রার নিশ্চিততার সঙ্গে নির্ধারণ করতে সক্ষম হন যে সংকেত পাঠাচ্ছিল গ্রহ বি, বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্রটি নয়।
বেটা পিক্টোরিস একটি ‘আর্লি-টাইপ’ নক্ষত্র। অর্থাৎ এটি আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রের তুলনায় বেশি উষ্ণ, আকারে বড় এবং গঠনগতভাবেও ভিন্ন। গবেষকেরা লিখেছেন, ‘আর্লি-টাইপ নক্ষত্রে রেডিও তরঙ্গের নির্গমন ঘটাতে পারে, এমন কোনো পরিচিত ভৌত প্রক্রিয়াই পর্যবেক্ষণ করা এই নির্গমনকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।’
এরপর গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এ ধরনের একটি রেডিও সংকেতকে আলাদা করে শনাক্ত করা কতটা কার্যকর। সংকেতটির বৈশিষ্ট্যগুলো ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন মেজার ইনস্ট্যাবিলিটি (Electron Cyclotron Maser Instability বা ইসিএমআই)-এর দিকে ইঙ্গিত করে। পৃথিবী ও বৃহস্পতিতে অরোরা তৈরির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া কাজ করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসিএমআই কোনো গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। দেখা যাচ্ছে, বেটা পিক্টোরিস বি-এর চৌম্বকক্ষেত্র বেশ শক্তিশালী। এটি গ্রহটির আগের মডেলিং এবং এর ডায়নামো বা অভ্যন্তরীণ যেসব প্রক্রিয়া চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, সেসব নিয়ে করা পূর্ববর্তী হিসাবের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষকেরা লিখেছেন, ‘এটি কোনো এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তির প্রথম সরাসরি পরিমাপ এবং এটি একটি তরুণ, বিশালাকার গ্যাসীয় গ্রহের জন্য ডায়নামো-স্কেলিংয়ের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
গবেষকেরা হিসাব করেছেন, গ্রহ বি-এর চৌম্বকক্ষেত্র অত্যন্ত শক্তিশালী, যা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের তুলনায় হাজার গুণেরও বেশি শক্তিশালী। গ্রহটির অরোরাজনিত রেডিও নির্গমন সম্ভবত এর দ্রুত ঘূর্ণনের মাধ্যমে শক্তি পাচ্ছে। গ্রহটি নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা সময় নেয়।
বেটা পিক্টোরিস বি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ২০০৮ সালে। গ্রহটি বিশালাকার, এর ভর বৃহস্পতির প্রায় ১০ গুণ। এখন এর সঙ্গে আরও একটি পরিচয় যুক্ত হলো—এটি প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট, যেখান থেকে আমরা একটি স্পষ্ট রেডিও সংকেত শনাক্ত করতে পেরেছি।
এখন গবেষকদের নজর অন্য গ্রহগুলোর দিকে। বিশেষ করে কাছাকাছি পাঁচটি নক্ষত্রব্যবস্থায় থাকা আরও সাতটি পরিচিত বিশালাকার এক্সোপ্ল্যানেটের দিকে। বেটা পিক্টোরিস বি-এর ক্ষেত্রে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সেভাবেই এসব গ্রহকেও শিগগির বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। গবেষকেরা লিখেছেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মের রেডিও অবজারভেটরিগুলোর যন্ত্রগত সংবেদনশীলতা প্রায় ৫ থেকে ৭ গুণ উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা এসব গ্রহকে শনাক্ত করার আওতায় নিয়ে আসবে।’
তথ্যসূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট