হোম > বিজ্ঞান

মঙ্গলে ‘ভালুক’ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মঙ্গলের মাটিকে খুঁজে পাওয়া সেই ভালুকের মুখাকৃতির ছবি। ছবি: নাসা

২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণাঞ্চলের উঁচু ভূমির ওপর দিয়ে ২৫১ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়ছিল একটি অরবিটার। সেখান থেকে মঙ্গল গ্রহের একটি পাহাড়ের ছবি তোলে সেটি। ছবিটি সাধারণই হওয়ার কথা ছিল। ২০০৬ সাল থেকে নাসার মার্স রিকনেসান্স অরবিটারের হাইরাইজ (HiRISE) ক্যামেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠের হাজার হাজার ছবি তুলেছে। এটিও সেসব ছবির মধ্যে আরেকটি সাধারণ ছবি হওয়ার কথা।

কিন্তু ছবিটি দেখার পর মনে হলো, মঙ্গল গ্রহের দিক থেকে যেন কিছু একটা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিতে দুটি কালো, গোলাকার গর্তকে দেখতে লাগছিল দুটি চোখের মতো। দুই গর্তের মাঝখানে একটি ফ্যাকাশে উঁচু অংশ নিচের দিকে সরু হয়ে নেমে গেছে, যা দেখতে অনেকটা ছোট্ট নাকের মতো। পুরো আকৃতিটিকে ঘিরে ছিল প্রায় নিখুঁত একটি গোলাকার ফাটল। ফলে সেটিকে একটি মাথার আকৃতি বলে মনে হচ্ছিল।

সবকিছু একসঙ্গে দেখলে অস্বীকার করা কঠিন যে, আকৃতিটি প্রায় হাস্যকর রকমের একটি আদুরে ছোট ভালুকের মতো দেখতে। কিন্তু এর পেছনে অবশ্য আরও সাধারণ একটি ব্যাখ্যা রয়েছে।

২০২৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার গ্রহবিজ্ঞানী এবং হাইরাইজ ক্যামেরা দলের প্রধান আলফ্রেড ম্যাকইউয়েন ব্যাখ্যা করেন, এখানে আসলে রয়েছে একটি পাহাড়, যার মধ্যে ভি-আকৃতির ধসের কাঠামো রয়েছে, দুটি গর্ত রয়েছে এবং মাথার চারপাশের মতো দেখতে একটি গোলাকার ফাটলের কাঠামো রয়েছে।

ছবির প্রতিটি অংশেরই সাধারণ ব্যাখ্যা রয়েছে। ম্যাকইউয়েনের ধারণা, গোলাকার ফাটলটি এমন কোনো পুরোনো আঘাতের গর্তের অবশিষ্ট চিহ্ন হতে পারে, যা একসময় তৈরি হয়েছিল কিন্তু বহু আগেই ভরে গেছে। পরে তার ওপর থাকা আলগা উপাদান বসে গিয়ে এই গোলাকার ফাটল তৈরি করে থাকতে পারে। আর ‘নাকের’ মতো দেখতে অংশটি হতে পারে কোনো আগ্নেয়গিরির ভেন্ট বা কাদার ভেন্ট বা পুরোনো প্রবাহ। এর চারপাশের ভি-আকৃতির অংশটি হয়তো সেই জায়গা, যেখান দিয়ে একসময় লাভা বা কাদা বাইরে প্রবাহিত হয়েছিল।

তাহলে আমরা মঙ্গলের পাথরের মধ্যে একটি মিষ্টি ছোট ভালুকের মুখ দেখতে পাচ্ছি কেন? এর নাম প্যারিডোলিয়া (pareidolia)। এটি মানুষের মস্তিষ্কের এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যার কারণে গাড়ির হেডলাইটকে চমকে ওঠা মুখের মতো মনে হয়, কিংবা দেয়ালের পানির দাগে ধর্মীয় কোনো প্রতীক বা অবয়ব দেখা যায়। মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত মুখ শনাক্ত করার জন্য এমনভাবে গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে কম আলোতে বা দূর থেকে।

এর কারণ হতে পারে, মানবজাতির ইতিহাসের বড় একটি সময়জুড়ে কোনো মুখ শনাক্ত করতে অন্য কোনো প্রাইমেটের তুলনায় মাত্র আধা সেকেন্ড আগে সক্ষম হওয়াটাই বিপদ শনাক্ত করা এবং বিপদ বুঝতে না পারার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারত। এর বিনিময়ে মানুষের মস্তিষ্ক এমন একটি প্যাটার্ন শনাক্তকারী ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত বিভিন্ন আকৃতি খুঁজে নেয়। ফলে আমরা সর্বত্র মুখ দেখতে পাই, এমনকি কক্ষপথ থেকে তোলা মঙ্গলের পাথুরে পৃষ্ঠের একটি দানাদার ছবিতেও।

মঙ্গল গ্রহ থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো আকৃতি দেখার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। ১৯৭৬ সালে নাসার ভাইকিং–১ অরবিটার মঙ্গলের সাইডোনিয়া অঞ্চলের একটি মেসার ছবি তুলেছিল। কম রেজল্যুশনের সেই ছবিতে সেটিকে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষের খোদাই করা মুখের মতো অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্য অরবিটারগুলো আরও উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি তোলে। হাইরাইজও সেসব ছবির মধ্যে ছিল। সেই ছবিগুলো ধীরে ধীরে বিতর্কের অবসান ঘটায়।

ওটি আসলে একটি মেসা ছিল। অর্থাৎ বড়, সাধারণ একটি পাথুরে ভূ-গঠন, যেটি একটি নির্দিষ্টভাবে আলো পড়ার কারণে মানুষের মুখের মতো দেখতে হয়েছিল। মঙ্গল গ্রহে আরও একেবারে ভিন্ন ধরনের একটি হাসিমুখের আকৃতি তুলনামূলকভাবে সম্প্রতি দেখা গেছে। তবে এর কারণ ছিল এর মুখের অভিব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কহীন।

এরপর, ২০২৪ সালের আগস্টে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ট্রেস গ্যাস অরবিটারের (Trace Gas Orbiter) সঙ্গে কাজ করা বিজ্ঞানীরা টেরা সিরেনাম নামের একটি অঞ্চলে ক্লোরাইড লবণের জমা বা স্তরগুলো তালিকাভুক্ত করছিলেন। সেই সময় তারা হাসিমুখের মতো দেখতে একটি আকৃতির সন্ধান পান। সেখানে শুকিয়ে যাওয়া লবণের একটি বৃত্তাকার স্তর ছিল, আর তার মধ্যে দুটি ছোট গর্ত ছিল ঠিক চোখের জায়গার মতো।

তবে এখানে আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লবণটি। এই লবণ হলো অগভীর পুকুর বা হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার পর পড়ে থাকা অবশিষ্ট অংশ। মঙ্গলের অপেক্ষাকৃত আর্দ্র অতীতে কোনো এক সময়ে এসব জলাশয় শুকিয়ে যায়। পানি বাষ্পীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে দ্রবীভূত খনিজের ঘনত্ব বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলো জমে স্ফটিক তৈরি করে।

এ ধরনের লবণাক্ত পানি প্রায়-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রাতেও তরল অবস্থায় থাকতে পারে। সাধারণ পানি যেখানে জমে শক্ত বরফ হয়ে যাবে, সেখানে এই লবণাক্ত পানি তরল থাকতে পারে। মঙ্গল গ্রহ যখন ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে যাচ্ছিল, তখন এই ধরনের চরম পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ত পানিই এমন জায়গা হতে পারে, যেখানে জীবন সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল। এই কারণেই এ ধরনের লবণের জমা ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বিজ্ঞানীরা সেখানে জীবনের অস্তিত্বের সম্ভাব্য চিহ্ন বা বায়োসিগনেচার খুঁজতে পারেন।

সেটি দেখতে হাসিমুখের মতো কি না, তা অবশ্য বিজ্ঞানীদের কাছে মূল বিষয় নয়। এরপর আরও সম্প্রতি মঙ্গলে জেলিফিশের মতো একটি আকৃতি, অদ্ভুত কিছু গর্ত, মানুষের হাড়ের মতো দেখতে একটি বস্তু এবং মাশরুমের মতো আকৃতিও দেখা গেছে। এর বেশির ভাগেরই এখন পর্যন্ত সাধারণ ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তবে এই সপ্তাহ পর্যন্তও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন, ওই গর্তগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে।

তারপরও মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে আমরা একের পর এক নতুন ও চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করে চলেছি। মঙ্গলে ভালুক না থাকলেও, লাল গ্রহটি নিজেই এখনও আমাদের অবাক করে চলেছে।

তথ্যসূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট