তিনি নিজের উদ্ভাবন আর দূরদর্শী চিন্তা দিয়ে আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। সেই মহান বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার শেষ জীবন কেটেছে চরম একাকিত্ব, দারিদ্র্য আর অবহেলায়। ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি যখন নিউ ইয়র্কার হোটেলের একটি কক্ষে তাঁর নিথর দেহ পাওয়া যায়, তখন তাঁর পকেটে পড়ে ছিল মাত্র ৩৩ সেন্ট!
অলটারনেটিং কারেন্ট (এসি) ব্যবস্থার জনক নিকোলা টেসলা আধুনিক বিশ্বকে বিদ্যুৎ সচল করার পথ দেখিয়েছিলেন। টেসলা কয়েল থেকে শুরু করে রেডিওর মৌলিক ধারণা—সবই তাঁর সৃষ্টি। কয়েকশ পেটেন্টের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও জীবনের শেষ ভাগে তিনি তীব্র আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত ছিলেন। টেসলা কখনো অর্থের পেছনে ছোটেননি; বরং তাঁর উপার্জিত প্রায় সমস্ত অর্থ ব্যয় করেছিলেন ‘ওয়ারডেনক্লিফ টাওয়ার’-এর মতো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং অসমাপ্ত প্রজেক্টে। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে বিনা মূল্যে তারহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। তাঁর এই ধারণা ব্যবসায়িক মহলের স্বার্থে আঘাত হেনেছিল। ব্যবসায়ীরা দ্রুতই তাঁকে বিনিয়োগকারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
জীবনের শেষ ১০ বছর নিউইয়র্কের বিভিন্ন হোটেলে কাটিয়েছেন এই নিভৃতচারী প্রতিভা। হোটেলের বিল পরিশোধ করতে না পেরে তাঁকে বারবার জায়গা বদল করতে হয়েছে। গবেষকেরা জানান, জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন এবং শহরের পার্কের কবুতরদের খাবার খাইয়েই সময় পার করতেন। বলা হয়ে থাকে, ওয়েস্টিন হাউস কোম্পানি (যাঁদের জন্য তিনি এসির পেটেন্ট ছেড়ে দিয়েছিলেন) থেকে পাওয়া একটি নামমাত্র মাসিক পেনশনের ওপর নির্ভর করেই তাঁর জীবন চলত। ৮৬ বছর বয়সে সেই হোটেলের ৩৩২৭ নম্বর কক্ষে কোনো উত্তরাধিকারী ছাড়াই চিরবিদায় নেন এই মহানায়ক।
মৃত্যুর সময় টেসলার হাতে নগদ টাকা না থাকলেও তাঁর রেখে যাওয়া গবেষণাপত্র, ড্রয়িং এবং হাজার হাজার পৃষ্ঠার নোটবুক ছিল অমূল্য। মৃত্যুর খবর পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং এলিয়েন প্রোপার্টি কাস্টোডিয়ান বিভাগের কর্মকর্তারা টেসলার সমস্ত নথিপত্র জব্দ করে। মার্কিন সরকারের ভয় ছিল, টেসলার গবেষণায় এমন কোনো ‘মরণরশ্মি’ (Death Ray)-এর নকশা থাকতে পারে যা শত্রুপক্ষের হাতে পড়লে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এটিই প্রমাণ করে, তাঁর আসল সম্পদ ছিল তাঁর বৌদ্ধিক সম্পত্তি (মেধা সম্পদ), যা সমকালীন সময়ের চেয়ে কয়েক যুগ এগিয়ে ছিল।
নগদ ৩৩ সেন্টের গল্পটি ঐতিহাসিকদের মতে অনেক সময় রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয় মূলত টেসলার চরম দারিদ্র্য বোঝাতে, তবে এটি চরম সত্য যে তিনি নিঃস্ব অবস্থাতেই মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় মূলধারার ইতিহাস থেকে তাঁর নাম প্রায় মুছে দেওয়ার চেষ্টা হলেও, বর্তমানে তিনি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃত।
আজকের বৈদ্যুতিক গ্রিড থেকে শুরু করে আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন—প্রতিটি প্রযুক্তির মূলে কোথাও না কোথাও টেসলার অবদান লুকিয়ে আছে। তাঁর সম্মানেই আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে চুম্বকীয় আবেশের এককের নাম রাখা হয়েছে ‘টেসলা’।
পৃথিবীকে যে মানুষটি তারহীন আলোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁর শূন্য পকেটের এই গল্পটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী শোকগাথা হয়ে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ অনেক সময় পার্থিব সম্পদে রিক্ত হলেও আগামী প্রজন্মের জন্য যে সম্পদ রেখে যান, তার মূল্য অপরিসীম।
তথ্যসূত্র: আর্কাইভস অব হিস্ট্রি অ্যান্ড সায়েন্স এবং এফবিআই ডিক্লাসিফায়েড ফাইলস