কল্পনা করুন, আপনি পৃথিবী থেকে ৩৫০ কিলোমিটার ওপরে মহাকাশ স্টেশনে ভাসছেন। আপনার ফেরার কথা পাঁচ মাস পর। কিন্তু এই সময় যখন ঘনিয়ে এল, পৃথিবী থেকে আপনাকে জানানো হলো, যে দেশের হয়ে আপনি মহাকাশে গিয়েছিলেন, সেই দেশের আর কোনো অস্তিত্ব নেই! মানচিত্র বদলে গেছে, পতাকা বদলে গেছে, এমনকি আপনার নিজের শহরটির নামও গেছে বদলে। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান ঘরানার সিনেমা নয়—সত্য ঘটনা। সের্গেই ক্রিকালেভ নামের এক সোভিয়েত নভোচারীর জীবনের এক অবিশ্বাস্য বাস্তব অধ্যায় এই গল্প। তবে ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে রয়েছেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নাগরিক’ হিসেবে।
১৯৯১ সালের ১৯ মে। সোভিয়েত মহাকাশচারী সের্গেই ক্রিকালেভ সয়ুজ টিএম-১২ মহাকাশযানে চড়ে পাড়ি জমান মির মহাকাশ স্টেশনে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কমান্ডার আনাতোলি আর্তসেবারস্কি এবং ব্রিটিশ নভোচারী হেলেন শারম্যান। ক্রিকালেভের মূল কাজ ছিল ৫ মাসের এক মিশন সম্পন্ন করা। তখনো কেউ জানত না, এই ৫ মাস আসলে ৩০০ দিনের দীর্ঘ এক প্রতীক্ষায় রূপ নিতে যাচ্ছে।
ক্রিকালেভ যখন মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখন নিচে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলছিল এক বিশাল রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে ক্যু বা অভ্যুত্থানচেষ্টার মাধ্যমে টালমাটাল হয়ে পড়ে মস্কো। ডিসেম্বরের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি আলাদা দেশের জন্ম হয় পৃথিবীতে। তারই একটি দেশ রাশিয়া। ক্রিকালেভ জন্মসূত্রে এখন সে দেশের বাসিন্দা। মহাকাশ স্টেশনে বসে তিনি খবর পেলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত অর্থ এ মুহূর্তে নতুন দেশটির সরকারের কাছে নেই। যে বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে তিনি উড়ে গিয়েছিলেন মহাকাশে, সেটি এখন কাজাখস্তান নামে এক স্বাধীন দেশের অংশ। রাজনৈতিক ডামাডোলে ক্রিকালেভ যেন মহাকাশে আটকা পড়া এক ‘ভুলে যাওয়া যাত্রী’ হয়ে রইলেন।
মিশন কন্ট্রোল থেকে ক্রিকালেভকে জানানো হলো, তাঁকে আরও কিছুদিন সেখানে থাকতে হবে। ক্রিকালেভ চাইলে মির স্টেশনে থাকা ইমার্জেন্সি ক্যাপসুল ব্যবহার করে পৃথিবীতে ফিরতে পারতেন। কিন্তু তিনি জানতেন, তিনি চলে এলে এই স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণ করার কেউ থাকবে না এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের এ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবে। আর
সে কারণে তিনি মহাশূন্যে একাকী থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মহাকাশ স্টেশনে নিঃসঙ্গ কাটানো দিনগুলোতে তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি হ্যাম রেডিও। এই রেডিওর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার একজন নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই নারী তাঁকে পৃথিবীর বিভিন্ন খবরাখবর জানাতেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি, পেশির ক্ষয় আর বিকিরণের ভয় মাথায় নিয়েও তিনি নিজের দায়িত্ব আঁকড়ে ধরেছিলেন। মনোবল চাঙা রাখতে তিনি মধু চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বদলে রসদ হিসেবে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল লেবু আর হর্স-র্যাডিশ।
অবশেষে ১০ মাস বা ৩১১ দিন পর, ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চ ক্রিকালেভ পৃথিবীতে অবতরণ করেন। জার্মানি ২৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে তাঁর বিকল্প যাত্রীর টিকিটের ব্যবস্থা করলে তবেই ফেরার পথ খোলে। ক্যাপসুল থেকে যখন তাঁকে বের করা হয়, তখন তাঁর শরীরে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল পতাকা এবং তাতে ছিল ৪ অক্ষরের ‘ইউএসএসআর’ লোগো। কিন্তু যে দেশে তিনি নামলেন, সেটি তখন ভিন্ন দেশ—কাজাখস্তান। তাঁর নিজের শহর লেনিনগ্রাদ হয়ে গেছে সেন্ট পিটার্সবার্গ। তাঁর ৬০০ রুবলের বেতন তখন একজন বাস ড্রাইভারের বেতনের চেয়ে কম। তিনি মহাকাশে থাকা অবস্থায়
৫ হাজারবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছেন এবং সে সময়ের মধ্যে তাঁর দেশের সীমানা ৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার কমে গেছে!
তবু সের্গেই ক্রিকালেভ থেমে থাকেননি। তিনি আবারও মহাকাশে গেছেন। প্রথম রাশিয়ান হিসেবে নাসার শাটলে চড়েছেন এবং তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের প্রথম অভিযাত্রী দলের সদস্য ছিলেন।
সূত্র: দ্য ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, গেটওয়ে টু রাশিয়া