প্রায় দুই দশক ধরে আমরা জানি, চাঁদে কোনো না কোনো ফর্মে অর্থাৎ কোনো না কোনো রূপে পানি রয়েছে। কিন্তু এখনো আমরা ঠিক জানি না, চাঁদের যেসব গর্তে সব সময় ছায়া থাকে, সেখানে কতটা ব্যবহারযোগ্য বরফ জমে আছে বা সেই বরফ কতটা গভীরে চাপা পড়ে আছে কিংবা ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে।
তবে একটি বিষয় আমরা জানি, সেই পানির বরফে পৌঁছানো খুবই কঠিন হবে। বরফগুলো রয়েছে গভীর ও দুর্গম গর্তের একেবারে তলদেশে, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। কোটি কোটি বছর ধরে সেগুলো সেখানে প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এবং তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে। চাঁদের সবচেয়ে মূল্যবান এলাকাগুলোর মধ্যে এগুলো অন্যতম, কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে পৌঁছানো ও অনুসন্ধান করাও সবচেয়ে কঠিন।
১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা-১ মহাকাশযান চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর থেকে চাঁদ নিয়ে অনুসন্ধান অনেক দূর এগিয়েছে। অ্যাপোলো অভিযান এবং পরবর্তী মিশনগুলো দেখিয়েছে, এখন চ্যালেঞ্জ শুধু চাঁদে পৌঁছানো নয়। বরং, এমন সব জায়গা অনুসন্ধান করা, যেখানে মানুষ কিংবা প্রচলিত ধরনের রোভার সহজে যেতে পারে না। শেষ পর্যন্ত মূল লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে চাঁদে যাওয়া অভিযাত্রীরা যেসব সম্পদ ব্যবহার করতে চাইবেন, চাঁদ নিজেই সেগুলোর কিছু সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নির্ধারণ করা।
প্রায় দুই দশক ধরে চীন ক্রমেই আরও উচ্চাভিলাষী একটি চন্দ্র অনুসন্ধান কর্মসূচি গড়ে তুলেছে। প্রাচীন চীনা চন্দ্রদেবী ‘চাং এ’-এর নামে এই কর্মসূচির নামকরণ করা হয়েছে। চীনের চাং এ-৭ মিশন ২০২৬ সালের আগস্টের শেষ দিকে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। তবে সম্প্রতি অন্য একটি চীনা রকেট ব্যর্থ হওয়ায় উৎক্ষেপণের নির্ধারিত সময় নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই সর্বশেষ মিশনটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই মিশনে চাঁদ অনুসন্ধানের বেশ কয়েকটি নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করা হবে। পুরো মিশনে থাকবে একটি কক্ষপথযান (অরবিটার), একটি ল্যান্ডার, একটি রোভার এবং একটি হপার। এ ছাড়া ক্যুয়েচিয়াও-২ নামের একটি চন্দ্র যোগাযোগ-উপগ্রহ ইতিমধ্যেই সেখানে রয়েছে। এটি ২০২৪ সালের মার্চে আলাদাভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। পরে এটি চাং এ-৬ মিশনকে সহায়তা করেছে। চাং এ-৭ মিশনের সময়ও এটি পৃথিবী ও চাঁদের পৃষ্ঠের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থা করবে।
মিশনটি ঠিক কোথায় অবতরণ করবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এইটকেন অববাহিকার শ্যাকলটন ক্রেটারের কাছে, অথবা তার আশপাশের এমন কোনো আলোকিত উঁচু এলাকাকে অবতরণের প্রধান সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই মিশনের আসল আকর্ষণ হতে যাচ্ছে হপারটি। চাকার ওপর চলা সাধারণ রোভারের বিপরীতে এটি লাফিয়ে লাফিয়ে ভাঙাচোরা ও অসমতল ভূমি পার হওয়ার জন্য তৈরি। একই সঙ্গে এটি এমন সব গর্তের গভীরে নেমে যেতে পারবে, যেখানে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। প্রচলিত যানবাহনের পক্ষে এসব জায়গায় ঢোকাই হয়তো সম্ভব নয়।
মিশনে হপার যুক্ত করার কারণও পরিষ্কার। চাঁদের ওই অঞ্চলে রয়েছে খাড়া গর্তের দেয়াল, ভাঙাচোরা ও অসমতল ভূমি এবং এমন সব এলাকা যেখানে সব সময় অন্ধকার থাকে। এর পাশাপাশি সেখানে চলাচল ও যোগাযোগের জন্য স্বয়ংক্রিয় বা অটোনোমাস নেভিগেশন ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।
চীনা বিজ্ঞানীরা চাঁদে পানির অস্তিত্বের কোনো নতুন প্রমাণ খুঁজতে যাচ্ছেন না। চাঁদের মেরু অঞ্চলে পানি থাকার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, চাঁদের ঠিক কোথায় সেই পানি রয়েছে, কী অবস্থায় রয়েছে, কী পরিমাণ ঘনত্বে রয়েছে এবং বাস্তবে সেটিকে সেখান থেকে সংগ্রহ বা ব্যবহার করা সম্ভব কি না।
এটি চাঁদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতদিন লক্ষ্য ছিল মূলত চাঁদকে অনুসন্ধান করা। এখন প্রশ্ন উঠছে, চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদকে ভবিষ্যতে বাস্তবে ব্যবহার করা যাবে কি না। অর্থাৎ, শুধু চাঁদে গিয়ে কী আছে তা দেখা নয়, বরং সেখানে থাকা সম্পদ ভবিষ্যৎ মানব অভিযানে কাজে লাগানো সম্ভব কি না, সেটিই হয়ে উঠছে পরবর্তী বড় লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: ফিজিক্স ডট অর্গ