যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০ জন ব্যক্তির মৃত্যু বা রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অনলাইন ‘স্লুথ’ বা শখের গোয়েন্দারা এই ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা বিশেষ রহস্য দেখলেও, নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলো এমন অনুমানগুলোকে ‘ন্যক্কারজনক’ এবং ‘মৃতের স্মৃতির অবমাননা’ বলে মনে করছে।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক)-এর প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল গ্রিলমেয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি বর্তমানে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার লানোতে নিজ বাড়িতে ৬৭ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই ২৯ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ফ্রেডি স্নাইডারকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে হত্যা ও চুরির মামলা করেছে।
কার্লের স্ত্রী লুইস গ্রিলমেয়ার জানান, এই হত্যার কারণ হতে পারে একটি ৯১১ কল। কয়েক মাস আগে এক ব্যক্তি বন্দুক নিয়ে তাঁদের জমিতে ঢুকে পড়েছিল। পাড়ার অন্য কেউ একজন পুলিশে খবর দিলে ওই ব্যক্তি মনে করেছিল কার্লই ফোনটি করেছিলেন। লুইস বলেন, ‘আমার স্বামী বেঁচে থাকলে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুনে পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন যে এগুলো কতটা ভিত্তিহীন। এটি নিছক একটি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ঘটা প্রতিশোধমূলক হামলা ছিল।’
সাবেক এয়ার ফোর্স জেনারেল উইলিয়াম নীল ম্যাককাসল্যান্ডের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। তিনি বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের গোপন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইউএফও (ভিনগ্রহের প্রাণীদের মহাকাশযান) বিষয়ক গবেষণাকারী সংস্থা ‘টু দ্য স্টারস’-এর পরামর্শক ছিলেন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী সুসান ম্যাককাসল্যান্ড জানিয়েছেন, জেনারেল ম্যাককাসল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে স্মৃতিভ্রম এবং দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। এমনকি নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি তাঁর ফোনটি বাড়িতে রেখে কেবল লাইসেন্স করা পিস্তলটি সঙ্গে নিয়েছিলেন। সুসান বিদ্রূপ করে বলেন, ‘অনেকে ভাবছেন এলিয়েনরা তাঁকে নিয়ে গেছে, অথচ স্যান্ডিয়া পাহাড়ের ওপর কোনো মাদারশিপ দেখা যাওয়ার খবর কিন্তু কেউ দেয়নি।’
এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে কেবল প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের নয়, বরং ল্যাবরেটরির সঙ্গে যুক্ত সাধারণ কর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাঁরা হলেন:
মেলিসা কাসিয়াস: লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এই প্রশাসনিক কর্মী নিউ মেক্সিকো থেকে নিখোঁজ হন। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে নিজেই হয়তো নিরুদ্দেশ হয়েছেন।
নুনো লরুইরো (এমআইটির পদার্থবিদ) : একজন প্রাক্তন সহপাঠীর হাতে খুন হন তিনি, যে কি না ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। খুনি ভিডিও রেকর্ডে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে।
এ ছাড়া এক গবেষক তাঁর মা-বাবার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হ্রদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে জনৈক ৫৯ বছর বয়সী বিজ্ঞানী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যাকে ষড়যন্ত্রকারীরা রহস্যজনক মৃত্যু বলে দাবি করছে।
বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক মিক ওয়েস্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোস্পেস এবং নিউক্লিয়ার গবেষণা খাতে প্রায় ৭ লাখ মানুষ কাজ করেন। সেই বিশাল জনশক্তির মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ১০টি মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া গাণিতিকভাবে কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুগুলো বাস্তব, পরিবারের শোকও বাস্তব, কিন্তু এখানে কোনো ষড়যন্ত্রের ছক নেই।’
এদিকে তীব্র জল্পনার মুখে মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের ওভারসাইট কমিটি এবং এফবিআই এই ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছে। তদন্তকারীরা মূলত কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য পাচারের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। তবে প্রাথমিক কোনো প্রমাণ মেলেনি।
শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর মতে, এই ধরনের ভিত্তিহীন জল্পনা বন্ধ হওয়া দরকার, কারণ এটি তাঁদের ব্যক্তিগত শোককে আরও বিষিয়ে তুলছে। লুইস গ্রিলমেয়ার তাঁর স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, কার্ল ছিলেন একজন অত্যন্ত দয়ালু মানুষ। তিনি বিমান চালানো এবং বাড়ির ছোট মানমন্দিরে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। তাঁর বড় বৈজ্ঞানিক কাজগুলো বাদ দিয়ে তাঁকে একটি বানোয়াট রহস্যের অংশ বানানো তাঁর স্মৃতির প্রতি চরম অবিচার।
তথ্যসূত্র: বিবিসি