হোম > বিজ্ঞান

নীল এলইডির পর এবার অনন্ত শক্তি: আরেকবার পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার মিশনে নাকামুরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

নীল এলইডি আবিষ্কার করে মানুষ জীবন আমূল বদলে দিয়েছেন নোবেলজয়ী সুজি নাকামুরা। ছবি: সংগৃহীত

তিনি ইতিমধ্যেই একবার বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে আবিষ্কৃত নীল লাইট-এমিটিং ডায়োড (এলইডি) আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আমূল পরিবর্তিত করেছে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, বড় স্ক্রিন, ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক বিলবোর্ড—সবকিছুই আজ আলো ছড়াচ্ছে তাঁর সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কল্যাণে।

এই অবদানের জন্য ২০১৪ সালে যৌথভাবে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান জাপানি বিজ্ঞানী সুজি নাকামুরা। অনেক বিশেষজ্ঞ তাঁর এই আবিষ্কারকে টমাস এডিসনের বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের সমতুল্য মনে করেন।

৭২ বছর বয়সে এসে, যখন অধিকাংশ মানুষ অবসরের কথা ভাবেন, তখন এই মহান বিজ্ঞানী মেতেছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ও নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে। তাঁর এবারের লক্ষ্য: নিউক্লিয়ার ফিউশন বা নিউক্লীয় সংযোজন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বে ‘অনন্ত’ ও পরিচ্ছন্ন (গ্রিন) শক্তি জোগান দেওয়া।

সান্তা বারবারার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউসিএসবি) অধ্যাপক নাকামুরা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘অবসরজীবন অত্যন্ত বিরক্তিকর।’ তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর এই নতুন প্রজেক্ট পূর্বের নীল এলইডি আবিষ্কারের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

‘ক্রোধ থেকে আবিষ্কার’: উপেক্ষিত এক ইঞ্জিনিয়ারের ঘুরে দাঁড়ানো

আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও সুজি নাকামুরার শুরুর পথটি একেবারেই সহজ ছিল না। একসময় সহকর্মীদের উপহাস আর কর্তৃপক্ষের অবহেলার পাত্র ছিলেন তিনি।

১৯৭৯ সালে জাপানের তৎকালীন প্রায় অপরিচিত এক রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান ‘নিচিয়া করপোরেশন’-এ মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ শুরু করেছিলেন নাকামুরা। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরে তাঁর তৈরি করা কোনো পণ্যই বাজারে ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। কোম্পানির খেলাধুলার মাঠেও সহকর্মীরা তাঁকে উদ্দেশ করে বলতেন, ‘তুমি কেন এখনো কোনো ভালো জিনিস তৈরি করতে পারলে না? তোমার চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত।’

চরম একাকী ও হতাশ হয়ে পড়া নাকামুরার জেদ চেপে বসে, তিনি পরে এটিকে বলেন ‘ক্রোধ থেকে আবিষ্কার’। চারপাশের মানুষকে ভুল প্রমাণ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়া করে বেড়াত।

বসের নির্দেশ অমান্য ও নীল এলইডি জয়

নীল এলইডি তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল ‘গ্যালিয়াম নাইট্রাইড’ নামের একটি উপাদানের রহস্য ভেদ করা। আইবিএম, জেনারেল ইলেকট্রিক ও তোশিবার মতো বিশ্বের বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলার খরচ করেও যা সমাধান করতে পারছিল না, নাকামুরা একাই সেই কাজে হাত দেন।

কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নোবুও ওগাওয়া তাঁকে বিশ্বাস করে ৩০ লাখ ডলারের বাজেট দিলেও, পরবর্তীতে কোম্পানির নতুন ম্যানেজমেন্ট তাঁকে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

জাপানি সংস্কৃতিতে ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ অমান্য করা প্রায় অসম্ভব হলেও, নাকামুরা সেই নির্দেশনার চিঠি সরাসরি ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেন। তিনি সাপ্তাহিক মিটিংগুলোতে যাওয়াও বন্ধ করে দেন যাতে কেউ জানতে না পারে তিনি কী কাজ করছেন।

অবশেষে ১৯৯৩ সালের ২৯ নভেম্বর বিশ্বকে চমকে দিয়ে নিচিয়া করপোরেশন ঘোষণা করে যে তারা নীল এলইডি জয় করেছে। বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস তখন লিখেছিল, ‘প্রকৃতিকে বশ করা এডিসনের যোগ্য উত্তরসূরি আসলে জাপানের এক অখ্যাত কোম্পানির এক অপরিচিত গবেষক।’

শেষ অধ্যায়: নিউক্লিয়ার ফিউশন ও অসীম শক্তির স্বপ্ন

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জির একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ বিশ্বজুড়ে যদি পুরোনো বাল্বের বদলে এলইডি ব্যবহার না হতো, তবে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ চাহিদা বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যা সামাল দেওয়া অসম্ভব হতো। কেবল গৃহস্থালি আলোতে এলইডি ব্যবহারের ফলে যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, তা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান।

তবে নাকামুরা এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর লক্ষ্য এমন এক পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা, যেখানে হাই-পালস লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটানো হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন নেই এবং দুর্ঘটনার কোনো ঝুঁকিও থাকবে না।

এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ব্লু লেজার ফিউশন’ নামের একটি স্টার্টআপ। যেখানে হাইড্রোজেন আইসোটোপের ওপর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ নিরাপদ শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

ইতিমধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটিতে লেজার-ফিউশন প্রক্রিয়ায় সফলভাবে অতিরিক্ত শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। নাকামুরা এখন এই বিজ্ঞানকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে কাজ করছেন।

তাঁদের লক্ষ্য, ২০৩২ সালের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার কাছে ১ গিগাওয়াটের একটি পাইলট ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা হবে, যা প্রায় সাড়ে ৭ থেকে ১০ লাখ ঘরের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।

তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীর বার্তা একটাই—‘ঝুঁকি নেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। আর এই ঝুঁকিই হয়তো আরেকবার বদলে দিতে পারে আমাদের পৃথিবীকে।

প্রাণের বিকাশের জন্য পৃথিবী নিখুঁত নয়, মহাবিশ্বে আছে অতি-বাসযোগ্য গ্রহ: গবেষণা

এআই ও পারমাণবিক যুদ্ধে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্তির শঙ্কা, ল্যানসেটের প্রতিবেদন

মঙ্গল গ্রহে ভোরবেলার ছবি তুলল ‘কিউরিওসিটি’

আণবিক প্রতিবিম্ব ধাঁধা মিলিয়ে রসায়নে নোবেল পেলেন অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই

জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন ধারার ভিত্তি তৈরি করে পদার্থে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

আলোয় মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের কৌশল উদ্ভাবনে চিকিৎসায় নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানী

এক দেশেই ২৯৬ প্রজাতির গিরগিটি, নতুন আবিষ্কার আরেকটি

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের প্রতিযোগিতায় তিন পরাশক্তি

এই প্রথম সৌরজগতের বাইরের এক গ্রহের রেডিও সংকেত শনাক্ত

সিলেটে পেট থেকে জ্যান্ত বাইম বের করার বিরল ঘটনা বিজ্ঞান সাময়িকীতে