অ্যাপোলো প্রোগ্রামের দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো চাঁদের কক্ষপথের উদ্দেশে সফলভাবে যাত্রা শুরু করেছে নাসার মানববাহী মিশন ‘আর্টেমিস-২’। গতকাল বুধবার (১ এপ্রিল) ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ৩২২ ফুট উচ্চতার বিশালাকার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। ওরিয়ন ক্যাপসুলে থাকা চার নভোচারী এখন ১০ দিনের এক ঐতিহাসিক সফরে চাঁদের পথে রয়েছেন।
উৎক্ষেপণের আগমুহূর্ত পর্যন্ত প্রকৌশলীদের বেশ কিছু কারিগরি সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে। রকেটে জ্বালানি ভরার সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হাইড্রোজেন লিকেজ পর্যবেক্ষণ করা হয়, যার কারণে অতীতে এই মিশন কয়েকবার পিছিয়ে গিয়েছিল। তবে উৎক্ষেপণের দিন কোনো বড় লিকেজ ধরা পড়েনি। শেষ মুহূর্তে ব্যাটারি সেন্সর ও রকেটের ‘ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেম’ (নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রকেট ধ্বংস করার ব্যবস্থা) নিয়ে জটিলতা দেখা দিলেও প্রকৌশলীরা তা দ্রুত সমাধান করে চূড়ান্ত ক্লিয়ারেন্স দেন।
এর আগে হাইড্রোজেন লিকেজ ও ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘হিট শিল্ড’ নিয়ে তদন্তের কারণে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে দফায় দফায় পিছিয়ে গিয়েছিল এই মিশন। অবশেষে বিপুল উৎসাহী জনতার উপস্থিতিতে ৩২ তলা ভবনের সমান উঁচু এই রকেট ফ্লোরিডার আকাশ আলোকিত করে উড্ডয়ন করে।
মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান উৎক্ষেপণের পাঁচ মিনিট পর বলেন, ‘চাঁদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমরা সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখছি।’
আর্টেমিস-২ মিশনের অভিযাত্রী দল
এই মিশনে অংশ নেওয়া চার নভোচারীর মধ্যে তিনজন নাসার অভিজ্ঞ সদস্য এবং একজন কানাডীয় নভোচারী রয়েছেন।
মিশনের কমান্ডার ৫০ বছর বয়সী রিড ওয়াইজম্যান। নাসার এই অভিজ্ঞ নভোচারী এর আগে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ টেস্ট পাইলট।
ভিক্টর গ্লোভার (৪৯) মার্কিন নৌবাহিনীর একজন বৈমানিক। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চন্দ্র অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। এর আগে তিনি স্পেসএক্স ক্রু-১ মিশনে ছিলেন।
ক্রিস্টিনা কোচ (৪৭) একজন মহাকাশ মিশন স্পেশালিস্ট। মহাকাশে দীর্ঘতম সময় (৩২৮ দিন) কাটানো নারী নভোচারীর রেকর্ড তাঁর দখলে। তিনি একাধিক স্পেসওয়াক ও মহাকাশ গবেষণায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
প্রথম কানাডীয় হিসেবে চাঁদে যাচ্ছেন জেরেমি হ্যানসেন (৫০)। এবারের মিশনে সাবেক এই ফাইটার পাইলটের অন্তর্ভুক্তি গভীর মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক।
১০ দিনের মিশন পরিকল্পনা ও চাঁদে পৌঁছানোর সময়
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি মিশনের ষষ্ঠ দিনে অর্থাৎ ৬ এপ্রিল চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছাবে। আর্টেমিস-২ সরাসরি চাঁদে অবতরণ করবে না, এটি কেবল ‘ফ্রি-রিটার্ন’ ট্র্যাজেক্টরি অনুসরণ করে চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে আসবে।
মিশনের প্রতিদিনের কার্যক্রম
প্রথম ও দ্বিতীয় দিন নভোচারীরা মহাকাশযানের সব সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এরপর ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ কৌশলের মাধ্যমে ওরিয়নকে চাঁদের কক্ষপথের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তৃতীয় ও চতুর্থ দিন নভোচারীরা সিস্টেম মনিটর করবেন এবং ওরিয়ন প্রাকৃতিকভাবেই পৃথিবীর দিকে ফেরার পথ (ফ্রি-রিটার্ন) তৈরি করবে।
পঞ্চম দিন মহাকাশযানটি চাঁদের অভিকর্ষ বলের মধ্যে প্রবেশ করবে। নভোচারীরা জরুরি অবস্থায় দ্রুত স্পেস স্যুট পরা ও আসন গ্রহণের মহড়া দেবেন। ষষ্ঠ দিন ওরিয়ন চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল (৬,৪৫০-৯,৬৫০ কিমি) ওপর দিয়ে উড়ে যাবে।
সপ্তম ও নবম দিন নভোচারীরা আর্চারসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামের আওতায় মহাকাশবিজ্ঞান ও শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন।
দশম দিনে ওরিয়ন সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। ১০ এপ্রিল এটির ফিরে আসার কথা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আর্টেমিস-২ মূলত পরবর্তী চন্দ্র অভিযানের সক্ষমতা প্রমাণের একটি পরীক্ষা। নাসার পরবর্তী মিশন ‘আর্টেমিস-৩’ ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডারের মাধ্যমে নভোচারীদের চাঁদের কক্ষপথ থেকে ল্যান্ডারে স্থানান্তরের পরীক্ষা চালানো হবে। আর ২০২৮ সালে ‘আর্টেমিস-৪’ মিশনের মাধ্যমে আবারও মানুষের পদচিহ্ন পড়বে চাঁদের মাটিতে।