হোম > বিজ্ঞান

কৃত্রিম প্রাণ তৈরির দ্বারপ্রান্তে বিজ্ঞান, এআই দিয়ে তৈরি হলো ভাইরাস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি

প্রকৃতির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কম্পিউটারের কোড দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রাণ বা কৃত্রিম জীব তৈরির পথে এক বিশাল ধাপ এগোলেন গবেষকেরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি অণুজীবের পূর্ণাঙ্গ জিনোম (ডিএনএ নকশা) তৈরি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা।

গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি এই অণুজীবগুলো কেবল কার্যকরই নয়, বরং কোষের ভেতর স্বাভাবিকভাবে বংশবৃদ্ধি করতে এবং নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এই সাফল্য বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ কৃত্রিম জীবন বা ‘সিনথেটিক লাইফ’ তৈরির বহুল আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটির বেশ কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য এটি যেমন যুগান্তকারী সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনই এআই ব্যবহার করে প্রাণ তৈরির এই ক্ষমতা গভীর নিরাপত্তা ও নৈতিক উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে।

জীব ও জড়ে সংমিশ্রণ: কৃত্রিম জীবনের পথ কত দূর?

ভাইরাস মূলত জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী এক সত্তা—এরা নিজে থেকে জীবিত নয়, তবে কোনো প্রাণকোষে প্রবেশ করলে বংশবৃদ্ধি ও দৈহিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, জড় ভাইরাস থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন কৃত্রিম প্রাণ তৈরির পথটি এখনো বেশ দুরূহ হলেও, তা আর অসম্ভব নয়।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বিবিসিকে বলেন, ‘জেনারেটিভ এআই দিয়ে জীববিজ্ঞানের জটিলতা নকশা করার ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন অধ্যায়। এবারই প্রথম এআই ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ জিনোম তৈরি করা সম্ভব হলো, যা কোষের ভেতরে বংশবৃদ্ধি ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এটি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।’

কৃত্রিম প্রাণের জটিলতার ব্যবধান বোঝাতে বিজ্ঞানীরা ডিএনএ-র ভাষার বা ‘বেস পেয়ারের’ হিসাব দিয়েছেন। যেমন:

কৃত্রিম ভাইরাস (ফাজের জিনোম): প্রায় ৫,৪০০ বেস পেয়ার

ক্ষুদ্রতম এককোষী জীবন্ত প্রাণ: প্রায় ৫,০০,০০০ বেস পেয়ার

মানব জিনোম: প্রায় ৩০০ কোটি বেস পেয়ার

অধ্যাপক ব্রায়ান হাই জানান, এআই ব্যবহার করে কোনো জীবিত অণুজীব তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ও শ্রমসাধ্য হলেও তা ‘একেবারে অসম্ভব নয়’। গবেষক দলটি এখন সেই লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

কম্পিউটারের বিট থেকে প্রাণের অণু

এই প্রযুক্তির কাজের ধরন অনেকটাই চ্যাটজিপিটি-এর মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) সমতুল্য। চ্যাটজিপিটি যেমন একটি বাক্য গঠনে পরবর্তী শব্দ অনুমান করে, স্ট্যানফোর্ডের তৈরি ‘ইভো-১’ (Evo1) এবং ‘ইভো-২’ (Evo2) নামের এআই মডেল দুটি ঠিক সেভাবেই প্রাণের জেনেটিক কোডের ভাষা অনুমান করে।

উদ্ভিদ, মানুষ, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের কোটি কোটি জিনোম ডেটার ওপর এআই মডেল দুটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এরপর এআই নিজেই সম্পূর্ণ নতুন একটি অণুজীবের পূর্ণাঙ্গ জিনোম নকশা করে।

এআই-এর তৈরি হাজার হাজার নকশা থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ৩০২টি নির্বাচন করে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি ভাইরাস ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সফলভাবে আক্রমণ ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

গবেষণাগারে পেট্রি ডিশে রাখা ব্যাকটেরিয়ার আস্তরণে যখন স্বচ্ছ চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করে—অর্থাৎ এআই-এর তৈরি ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া খাওয়া শুরু করে—তখন গবেষক দল আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন।

ইতিহাসে প্রথম কম্পিউটারে বসে জীবন নকশা

স্পেনের পম্পেও ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম জীববিজ্ঞান ল্যাবের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল এই গবেষণা সম্পর্কে বলেন, ‘ইতিহাসে এই প্রথম আমরা সরাসরি কম্পিউটারে বসে জীবন নকশা করা শুরু করছি। এটি বিজ্ঞানের এক বিরাট মোড়।’

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক প্যাট্রিক সাই এটিকে বিজ্ঞান জগতের এক ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ বলে অভিহিত করে বলেন, ‘এআই মডেলগুলো এখন বিবর্তনের নিয়ম শিখে নিজেরা জিনোম লেখা শুরু করেছে। এটি এআই-সহায়ক জিনোম সম্পাদনার নতুন যুগ।’

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে ওষুধ-প্রতিরোধী মারাত্মক ‘সুপারবাগ’ ধ্বংসের ফাজ থেরাপি, জিনগত রোগের জটিল এনজাইম এবং ক্যানসার চিকিৎসার অ্যান্টিবডি সরাসরি কম্পিউটারে বসে তৈরি করা সম্ভব হবে।

প্রজাতি সৃষ্টি ও চরম জৈবনিরাপত্তা ঝুঁকি

কৃত্রিম প্রাণ ও জীব সৃষ্টির এই অদম্য ক্ষমতা বিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ হলেও, এর অপব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিশেষজ্ঞদের ভয়, মানুষ যদি এআই দিয়ে প্রাণ বা ভাইরাস তৈরি করা শিখে যায়, তবে দুষ্কৃতকারীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণঘাতী কৃত্রিম জীবাণু বা নতুন কোনো মরণব্যাধি তৈরি করে ফেলতে পারে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির ড. থমাস ইঙ্গলসবি এবং ড. মরিৎস হানকে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে লিখেছেন, এই গবেষণা ‘জরুরি জৈবনিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষার প্রশ্ন’ সামনে এনেছে। তাঁরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, মানুষ ও জটিল প্রাণীকে আক্রমণ করতে পারে এমন কৃত্রিম ভাইরাসের নকশা কোনোভাবেই অনুমোদন করা উচিত নয়।

তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, গবেষণায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। জটিল প্রাণীদের আক্রমণ করতে পারে এমন কোনো তথ্য এআই-কে শেখানো হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও বিশ্বস্ত গবেষণাগারে সম্পাদন করা হয়েছে।

এআই দিয়ে নতুন ১৬টি ভাইরাস বানালেন বিজ্ঞানীরা, মানুষের জন্য কতটা হুমকি

এই প্রথম এত কাছ থেকে তোলা হলো সূর্যপৃষ্ঠের ছবি, ধরা পড়ল অনন্য ঘূর্ণাবর্ত

চাঁদে আছড়ে পড়ল স্পেসএক্সের রকেট, মহাকাশ বর্জ্য নিয়ে বাড়ল শঙ্কা

কেন প্রতিদিনই অ্যাভোকাডো ফুলের লিঙ্গ বদলায়—৯৯ বছর পর রহস্য উদ্‌ঘাটন

আমাদের আগেও কি পৃথিবীতে উন্নত কোনো সভ্যতা ছিল—নতুন অনুসন্ধান

৪০০ বছর বাঁচে যে হাঙর, দীর্ঘায়ু ও মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের সূত্র খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা

ইতিহাস গড়ে গণিতের ‘নোবেল’ জিতলেন দুই চীনা গবেষক

গ্রহাণুর আঘাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে মহাজাগতিক ‘প্রতিরক্ষা ব্যূহ’ গড়ছে চীন

৭ কোটি বছর পুরোনো টি-রেক্সের জীবাশ্ম বিক্রি হলো ৫০ মিলিয়ন ডলারে

মহাকাশে প্রথমবারের মতো চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা