‘শেখ হাসিনা প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসবেন, সবাই ঢোল বাজিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবে—এটি কি কখনো সম্ভব?’ এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, নিজের দেশের মানুষের রক্ত ঝরিয়ে যাঁরা দেশ ছেড়ে চলে যান, তাঁরা আবার ফিরে এসে ক্ষমতায় বসবেন, জনগণ তা মেনে নেবে না।
আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) মিলনায়তনে ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, ‘যিনি এত মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, এত নির্যাতন চালিয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন, তিনি এখন বলছেন, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের চোখের সামনে এখনো ভাসছে সেই তরতাজা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মুখ, যাঁরা বুক পেতে বুলেট গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে মহিমান্বিত গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, সেই বিপ্লব কি মুছে ফেলা যাবে? আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, মুগ্ধের আত্মত্যাগ, ওয়াসিম আকরামের আত্মত্যাগ—এসব কি মুছে ফেলা যাবে?’
রিজভী আরও বলেন, ‘যারা নিজের দেশের সন্তানের রক্ত পান করতে দ্বিধা করে না, তারা আবার উড়ে এসে জুড়ে বসবে আর জনগণ তা মেনে নেবে—এটা কোনো দিনই সম্ভব নয়। বাংলার মাটি বীরের মাটি। এই মাটি বহু বীরের জন্ম দিয়েছে।’
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের চেতনার মিল তুলে ধরে রিজভী বলেন, মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে। সেই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাও ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা। আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এ দেশীয় অনুচরেরা যতই চেষ্টা করুক, ১৮ কোটি মানুষের এই দেশকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বাংলাদেশকে কখনো আধিপত্যবাদের থাবার মধ্যে নিয়ে আসা যাবে না।
৭ নভেম্বরের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার দিন নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ারও দিন। এর তাৎপর্য বিদেশি প্রভাবমুক্ত পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেও রয়েছে। বাংলাদেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কার সঙ্গে বৈরিতা থাকবে কিংবা কার সঙ্গে চুক্তি করবে, তা বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের নিজস্ব বিষয়। অন্য কারও নির্দেশে দেশ পরিচালিত হবে না।
দীর্ঘদিন দিবসটি পালনে বাধার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৬ সাল থেকে দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছিল। তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ ১৭ বছর তা সরকারিভাবে পালন করতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সংগঠন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দিবসটি পালন করেছে। ফলে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য ও অন্তর্নিহিত চেতনা মুছে যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের অতীত আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্ত বৃথা যায়নি। এসব ঘটনা দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেতনা সৃষ্টি করেছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে রিজভী বলেন, তিনি একটি দক্ষ ও চৌকস সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীকে রাজনীতিকরণের পক্ষে ছিলেন না তিনি। আজকের আধুনিক সেনাবাহিনী জিয়াউর রহমানের অবদান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
সভাপতির বক্তব্যে রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছিল। বিগত সাড়ে ১৭ বছর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। তবে এবার পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে দিবসটি উদ্যাপন করেছে।
এ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুমসহ কেন্দ্রীয়, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।