জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্কের কাছে চিঠি লিখেছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনার নিয়োগ দেওয়া আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডটি স্ট্রিট চেম্বার। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের’ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এই চিঠি লেখা হয়। গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) চিঠিটি লেখা হয়।
চিঠিতে লেখা হয়, ‘মাননীয় হাইকমিশনার, আমি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার আইনগত পরামর্শক হিসেবে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আপনার দপ্তর থেকে প্রকাশিত “হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস অ্যান্ড অ্যাবিউজেস রিলেটেড টু দ্য প্রোটেস্ট অব জুলাই অ্যান্ড আগস্ট ২০২৪ ইন বাংলাদেশ”—শীর্ষক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট (পরে রিপোর্ট) সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ জানাতেই এ পত্র।’
ডটি স্ট্রিটের লেখা চিঠিতে বলা হয়, ‘এখন এমন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে যে—এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব সরকারি নথিপত্রের ভিত্তিতেও—শেখ হাসিনার সরকারকে সহিংসভাবে উৎখাত করার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়েছিল, তার আলোকে দেখা যাচ্ছে—ওই সময়ে ১ হাজার ৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার বিষয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের উপসংহার ছিল অত্যন্ত ভুল ও বাস্তবতাবিবর্জিত।’
এতে আরও বলা হয়, ‘সরকারি গেজেটে এখন নিশ্চিত করা হয়েছে যে—প্রকৃত সংখ্যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। আরও নিরপেক্ষ কিছু প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আরও কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বহুল প্রচারিত সংখ্যার তুলনায় সামান্য অংশমাত্র। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের উপসংহার সত্যের সঙ্গে এত ব্যাপকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি তথ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে ও বৈধতা দেওয়ার জন্য এ ধরনের ভুল তথ্য ব্যবহার একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সেই কারণে বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে, প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার স্বার্থে আপনার দপ্তর যেন একটি সংশোধনী এবং প্রকাশ্য প্রত্যাহার বিবৃতি জারি করে।’
শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, ‘এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির পেছনে সম্ভবত জাতিসংঘের তদন্ত দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করার ব্যর্থতা দায়ী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের বিষয়ে একটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধান তদন্ত পরিচালনা করেছে।’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। এসব অভিযোগ বহু বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) নথিভুক্ত করেছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটরের দপ্তরে দাখিল করা অনুচ্ছেদ ১৫ যোগাযোগপত্রেরও বিষয়বস্তু হয়েছে।’
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘তদুপরি, ড. ইউনূস নিজেই স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে—শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে আন্দোলন, তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান ছিল না; বরং এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি অভিযান। তিনি তাঁর বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমকে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে পরিচালিত ওএইচসিএইচআরের তথ্য অনুসন্ধান মিশন কতটা ড. ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবাধীন ছিল, তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তথ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়া পরিচালনায় স্পষ্টতই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, সেখানে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।’
ফলকার তুর্কের কাছে পাঠানো ডটি স্ট্রিটের চিঠিতে বলা হয়, ‘আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো—যা প্রতিবেদন নিজেই স্বীকার করেছে—তথ্য অনুসন্ধানের সময়সীমা কেবল ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কথিত নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ওএইচসিএইচআর অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো তদন্ত করার সুযোগই পায়নি। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে সেই অভিযোগগুলোরই প্রতিধ্বনি করা হয়েছে, যেগুলোকে ভিত্তি করে অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করা হয়েছিল।’
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নিহতের সংখ্যার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘উপরোক্ত উদ্বেগগুলোর পরও এই মুহূর্তে সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিবেদনের সেই উপসংহার, যেখানে বলা হয়েছে, “বিক্ষোভ চলাকালে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন, যাঁদের অধিকাংশই সামরিক রাইফেল ও ধাতব ছররাভর্তি শটগানের গুলিতে নিহত হয়েছেন, যা সাধারণত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।’ ওএইচসিএইচআর জানিয়েছে, তারা এই ১ হাজার ৪০০ জনের ‘আনুমানিক’ সংখ্যা নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে নাগরিক সমাজের সংগঠনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত বিস্তারিত মৃত্যুর তালিকা তুলনা করে এবং পুনরাবৃত্ত তথ্য বাদ দিয়ে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “এই তথ্যের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর মূল্যায়ন করছে যে—বিক্ষোভসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন পর্যন্ত হতে পারে।’’’
শেখ হাসিনার নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানটি চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, ‘এ ছাড়া সেখানে (জাতিসংঘের প্রতিবেদনে) উল্লেখ করা হয়েছে, মোট মৃত্যুর ৭৮ শতাংশ (যা ওএইচসিএইচআরের ১ হাজার ৪০০ জনের হিসাব অনুযায়ী এক হাজারের বেশি মৃত্যুর সমান) এমন আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে ঘটেছে, যা সাধারণত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করে থাকে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব সরকারি গেজেটেই (সংযুক্ত) নিশ্চিত করা হয়েছে যে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৩৪ জন, যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তবে ৮৩৪ সংখ্যাটিও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখানে প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শেখ হাসিনার সরকারের বিরোধী ছাত্র নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিজেই মৃত্যুর সংখ্যা আরও কম, অর্থাৎ ৬৫০ জন বলে উল্লেখ করেছে।’
সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ উৎসের ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালিত হলে ‘প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এরচেয়ে কম হবে’ বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। এতে বলা হয়, ‘সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে এত মানুষের প্রাণহানি নিঃসন্দেহে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। শেখ হাসিনার সরকার তখন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সম্ভাব্য মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় ছিল। কিন্তু অনেক বেশিসংখ্যক মৃত্যুর দাবি ব্যবহার করা হয়েছিল সহিংসতার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তিকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরতে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে উপস্থাপন করতে। এই অভিযোগই ছিল তাঁর সরকারকে উৎখাতের প্রচারণার কেন্দ্রীয় উপাদান।’
চিঠিতে ফলকার তুর্ককে নির্দেশ করে বলা হয়, ‘আপনার দপ্তরের একটি প্রতিবেদন এই প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে স্পষ্টতই মিথ্যা ও উসকানিমূলক তথ্যকে সমর্থন করার জন্য এবং সরকার উৎখাতের সহিংস কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোকে ভবিষ্যতে অপব্যবহারের একটি উদ্বেগজনক নজির স্থাপন করে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে যে সুস্পষ্ট ও গুরুতর ভুল রয়েছে এবং আপনার দপ্তর পরিচালিত তথ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার স্বার্থে, ওএইচসিএইচআরকে বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে যে, তারা ১ হাজার ৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার দাবিসংবলিত অংশটি প্রকাশ্যে প্রত্যাহার ও সংশোধন করুক।’
চিঠিতে আহ্বান জানানো হয়, ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে ভুল উপস্থাপনার মাধ্যমে জাতিসংঘ যেন কোনো মিথ্যা বয়ানকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজন। মাননীয় হাইকমিশনার, অনুগ্রহ করে আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও বিবেচনার আশ্বাস গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার সদয় মনোযোগের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’