হোম > রাজনীতি

বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের সম্ভাবনা চলতি বছরে কম

রেজা করিম, ঢাকা 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা জোরেশোরে চলছে। দলের নীতিনির্ধারকেরা শিগগির সপ্তম কাউন্সিল করার কথা বললেও দিনক্ষণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলছেন না।

বিএনপির সূত্র ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, কাউন্সিলের আগে দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হবে। কাউন্সিলের প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব, শূন্য পদ পূরণ এবং বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব কাজ শেষ করেই জাতীয় কাউন্সিল করতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড। এদিকে আগামী ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর আভাস রয়েছে। ফলে চলতি বছর কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব আমরা কাউন্সিল করতে চাই। এটার সিদ্ধান্ত আছে। তবে এর জন্য সুনির্দিষ্ট চিন্তা করতে হবে। তারিখ এবং এর জন্য বিভিন্ন কমিটিসহ নানা প্রস্তুতির বিষয় আছে।’

বিএনপির সর্বশেষ অর্থাৎ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ২০১৯ সালে সপ্তম কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপ, মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে প্রকাশ্য ও বড় জমায়েত বা কাউন্সিল আয়োজন সম্ভব ছিল না।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ৪ এপ্রিল। বৈঠক শেষে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) বলেছিলেন, দ্রুত দলকে কাউন্সিলের দিকে নেওয়ার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কাউন্সিলের সব প্রস্তুতি গুছিয়ে আনতে অন্তত কয়েক মাস লাগবে। তাঁর ওই বক্তব্যের পর চলতি বছরের শেষ দিকে কাউন্সিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘কাউন্সিলের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের বলেছিলেন, এই বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল হবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে খেয়াল রেখে তা আগে-পরে হতে পারে।’

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেছেন, চলতি বছর কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এ বছরের আর চার মাস আছে। যখন তৎকালীন মহাসচিব কাউন্সিলের কথা বলেছিলেন, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতির বিষয় আছে। ফলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের আগে কাউন্সিলের সম্ভাবনা কম।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের কথা অনুযায়ী, দলকে অনেকটা গুছিয়েই জাতীয় কাউন্সিল করতে চায় বিএনপি। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন এই প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে শিগগির নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, কাউন্সিল অনুষ্ঠানের জন্য দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন করতে হবে। এতে সময় লাগবে। আবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে কমিটি গঠন করা হলে এ নিয়ে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও কোন্দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সব বিবেচনায় নিয়েই কাউন্সিল করা হবে। এ জন্য কাউন্সিল এ বছর হচ্ছে না।

জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চারজন নতুন মুখ যুক্ত করা হয়েছে। তবে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে এখনো তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি পদও শূন্য। দলীয় সূত্র বলেছে, এসব পদে প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের আনা হতে পারে। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের মধ্য থেকে একজনকে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলে আলোচনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি দুই মাস ধরে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কোথাও নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হচ্ছে, কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনা, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও রদবদলের কাজও চলছে।

বিএনপির সূত্র বলছে, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজে আরও গতি এসেছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এলে বিভাগভিত্তিক জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ আরও জোরালো হতে পারে। বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন ও রদবদল করা হবে। দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, শূন্য পদ পূরণ, অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটি এবং তৃণমূলে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পরই জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হবে।

জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে এটুকু বলতে পারি, খুব শিগগির হবে।’