হোম > রাজনীতি

নির্বাচনী সমঝোতা: জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে টালমাটাল এনসিপি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তকে ঘিরে জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণ যোদ্ধাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে অস্থিরতা তুঙ্গে উঠেছে। দলটির ভেতরের একটি বড় অংশের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকের মাধ্যমে না নিয়ে সাধারণ সভায়ও আলোচনা করার দরকার ছিল। ‘মতামত উপেক্ষিত হওয়ার’ প্রতিবাদে অনেক নেতা-কর্মী পদত্যাগের কথাও ভাবছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

এরই মধ্যে গতকাল ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের কথা জানিয়ে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। একই দিন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন না করার দাবি জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে ‘স্মারকলিপি’ দিয়েছেন।

তাসনিম জারার দল থেকে পদত্যাগ

ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্রও পাঠিয়েছেন তাসনিম জারা। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উশ সালেহিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তাসনিম জারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পদত্যাগের কথা জানিয়ে টেক্সট করেছেন। তিনি আহবায়কের কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন।’

নাহিদকে ৩০ নেতার স্মারকলিপি

২৫ ডিসেম্বর দলের নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেয় এনসিপি।

পরদিন গত শুক্রবার রাতে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বৈঠকে দুই দল একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে আজ রোববারই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে এনসিপির পক্ষে এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়নি বলে অভিযোগ দলের অনেকের। তাঁরা বলছেন, নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকেও সদস্যদের বড় একটি অংশ অনুপস্থিত ছিলেন। সেখানে অনেকের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে দলের ভেতরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

গতকাল এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন না করার দাবি জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, দলের নির্বাহী কমিটি ও তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ২৫ ডিসেম্বর মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে নির্বাহী কাউন্সিলের মিটিং ডাকা হয়। অনেকেই সেদিন ঢাকার বাইরে ছিলেন। অনেকে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে ছিলেন। সব মিলিয়ে ওই বৈঠকে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ উপস্থিত থাকতে পারেননি। একটি দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট বা সমঝোতার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত এভাবে নেওয়া যথাযথ নয়।

এনসিপির মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উশ সালেহীন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে অনেকের মতভিন্নতা রয়েছে। সেই ভিন্নমতের কথা দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জানানো হয়েছে।

এনসিপির নারীনেত্রীদের একটি বড় অংশের মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন করার বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। দলের নির্বাহী কাউন্সিলের অন্তত ছয়জন নারী সদস্য আহ্বায়ককে জানিয়েছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হলে তাঁরা এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে পরে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ‘দলীয় স্বার্থে’ সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে জানা গেছে। দলের নারীদের কেউ কেউ আবার জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষেও।

দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপির নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ শুরু থেকেই এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে একটি অংশ সংসদে আসন পাওয়া নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রতিষ্ঠিত পুরোনো দল জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনেই বর্তমানে দলটিতে এই অস্থিরতা।

মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দায় স্বীকার করে ক্ষমাপ্রার্থনা এবং নারী বিষয়ে কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মূলত এই দুই ইস্যুতে এনসিপির একাংশের মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে।

এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, দলের বৃহত্তর স্বার্থ এবং সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখেই জামায়াতের সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাদের একটি অংশ এখনো এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন।

দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির উচিত গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাইয়ে প্রকাশিত নতুন রাজনীতি এবং নতুন বন্দোবস্তের দাবিকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া। শুরুতে কিছু সংগ্রাম থাকলেও একসময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সফল হওয়া সম্ভব হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করি।’

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিকভাবে না হওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিকভাবেই নেওয়া হয়েছে। নির্বাহী কাউন্সিলে কোরাম পূর্ণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

‘মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশ’ দিয়ে বৈঠকের অভিযোগ বিষয়ে রাসিন বলেন, নির্বাহী কাউন্সিল গঠনের সময় যে নীতি ছিল, সেখানেই বলা হয়েছে, যেকোনো সময় জরুরি সভা ডাকা যাবে।

জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্ত দৃশ্যত চূড়ান্ত হলেও আসনসংখ্যা নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত নয়। এ বিষয়ে এনসিপির নেতারা বলছেন, সংখ্যাটি এখনো চূড়ান্ত নয়। ৩০টি আসন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। এটা আরও বাড়তেও পারে। এই আসনগুলোতে জামায়াত তাদের প্রার্থী তুলে নেবে।

তাসনিম জারার পদত্যাগ

এমন প্রেক্ষাপটে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। গতকাল সন্ধ্যায় এক ফেসবুক পোস্টে এসব কথা জানান তিনি।

ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা ঢাকা-৯-এর আওতাভুক্ত খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসীর সমর্থন কামনা করেছেন। নিজেকে এলাকার মেয়ে হিসেবে উল্লেখ করে তিনি পোস্টে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

জারা আরও লেখেন, ‘একটা দলের প্রার্থী হলে সেই দলের স্থানীয় অফিস থাকে, সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী থাকে। সরকার ও প্রশাসনের সাথে নিরাপত্তা বা অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি ও শঙ্কা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে। তবে আমি যেহেতু কোনো দলের সাথে থাকছি না, তাই আমার সেসব কিছুই থাকবে না। আমার একমাত্র ভরসা আপনারা।’

জারার পদত্যাগ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘তাসনিম জারা একক সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য আমার কাছে নেই।’

জামায়াতের কারণে জোটও চাপে

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এনসিপির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটও ভাঙনের মুখে বলে আভাস পাওয়া গেছে। জোটের তিন দলের অন্যতম রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন বলেছে, তারা কোনো অবস্থাতেই জামায়াতকে নিয়ে নির্বাচন করবে না। দলটির সভাপতি হাসনাত কাইয়ূমসহ নেতারা গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিএনপি বা জামায়াত কারও সঙ্গেই না গিয়ে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলা ছিল তাদের জোট গঠনের লক্ষ্য। অন্যদিকে এ সমঝোতার খবরে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি হিসেবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অবস্থান নিয়ে শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আরেক জোট সদস্য এবি পার্টির জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় আপত্তি নেই।

জোটসঙ্গী এবি পার্টি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনায় আছে কি না জানতে চাইলে এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘আলোচনাটা দলীয়ভাবে হচ্ছে, জোটগতভাবে নয়। এবি পার্টির সঙ্গে জামায়াতের আলাদা আলোচনা চলছে। এবি পার্টি আমাদের আলোচনার অংশীদার নয়।’

ছাত্রদের দাবির তোয়াক্কা না করে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে: নাহিদ

অবশেষে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া আসনে প্রার্থী ঘোষণা, কে তিনি

অভিজ্ঞতাহীন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দিয়ে আর্থিক খাতে অরাজকতার সূচনা হলো: ইসলামী আন্দোলন

ঋণ পুনঃ তফসিলের সুবিধাভোগীকে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক করলে প্রশ্ন উঠবেই: জামায়াত

বুয়েটে রাজনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগ আবরার ফাহাদের ভাইয়ের, ব্যাখ্যা দিলেন নাসীরুদ্দীন

আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করল সরকার: নাহিদ ইসলাম

গণভোট হলো জুলাই সনদের সর্বোচ্চ বৈধতা: বদিউল আলম মজুমদার

ভোটে হারানোর কায়দাগুলো চিনে নিয়েছি: জামায়াত আমির

রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের পর গ্রেপ্তারের দাবি নাহিদ ইসলামের

পিলখানা ট্রাজেডির জন্য তৎকালীন সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবাই দোষী: জামায়াত আমির