ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান প্রথম অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত না হওয়ায় হতাশ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দলটির নেতারা বলছেন, সংসদীয় কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে ‘পুরোনো পথে’ ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব নেওয়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এনসিপির নেতারা বলছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও অধিকারভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক পরিবর্তন আসবে এবং নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জবাবদিহির বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করা হয়নি। স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য জারি করা সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলে বিল পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগে আগের মতো সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হলো।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করার একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন আবার আগের ‘স্টাইলে’ ফিরে যাওয়ার পুরো পথটাই যেন পরিষ্কার হয়ে গেল। যদি রাষ্ট্র আগের মতো দলীয়করণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর দিকে ফিরে যায়, তাহলে সেটি জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত হবে। তাঁর মতে, এটি মূলত জনরায়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ একটি সূচনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সংসদের ভেতরে আলোচনা, যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে। রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে দাবি আদায়ের যে সংস্কৃতি, সেটি কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
বিল পাস নিয়ে ইতিমধ্যে সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশসহ ৯৮টি হুবহু বিল আকারে পাসের বিষয়ে একমত হয়েছিল সরকারি ও বিরোধী দল। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল পাসের জন্য গত শুক্রবার সংসদে উত্থাপন হলে তিনটি সংশোধনী দেন সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য, যা গ্রহণ করে বিলটি পাস করা হয়। এ নিয়ে অধিবেশনে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্য ভঙ্গের অভিযোগও তোলেন।
এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, সংসদে সরকারি দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণভোটের জনরায়কে অবজ্ঞা করছে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি ৫১ শতাংশ রায় পেয়েছে। জনগণ তাঁদের আইন প্রণয়ন করার ম্যান্ডেট দিয়েছে, অন্য কিছু নয়। ৫১ শতাংশের রায় দিয়ে ৭০ শতাংশের রায়কে কোনোভাবেই অবজ্ঞা কিংবা অস্বীকার করা উচিত নয়। কিন্তু তাঁরা সেটাই করছেন।
এনসিপির নেতাদের মতে, এই হতাশা শুধু এনসিপির নয়, সাধারণ জনগণও হতাশ। যেসব দাবি ও প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো কোনো একক দলের নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের দাবি। ফলে এসব বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।
এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাদ পড়ায় রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের বদলে পুরোনো ধারায় ফিরে যাওয়ার লক্ষণই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।
এদিকে নাহিদ ইসলাম গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের অনেক অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেই ওয়াদা সরকার ভঙ্গ করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা ওয়াদা ভঙ্গ করেছে, তাদের পরিণতি খুব ভালো হয়নি।
অবশ্য এনসিপির নেতারা সংসদে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করার কথাও বলছেন। যেমন আগের মতো কুরুচিপূর্ণ বাগ্বিতণ্ডা বা গালাগালি নেই, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সহনশীল এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দুপক্ষের মধ্যে ঐকমত্যও দেখা গেছে।