আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়ন ও বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থেকেই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
আজ শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ মার্কসবাদী) উদ্যোগে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস। গণ-অভ্যুত্থানগুলোর সঙ্গে শাসকদের ‘উন্নয়ন’ দর্শন সম্পর্কিত। আইয়ুব খান, এরশাদ, হাসিনা সবাই উন্নয়নের কথা বলে অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন করার পরপরই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। কারণ এ সকল উন্নয়নের মাধ্যমে পুঁজিপতিদের লাভ হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ সকল ক্ষোভের ফলে গণ-অভ্যুত্থান জন্ম নিয়েছে।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘উনসত্তরে নেতৃত্ব ও দাবি জনগণের কাছে পরিচিত ছিল, নব্বইয়েও একই অবস্থা ছিল। চব্বিশে সেরকম ছিল না তারপরেও কেন গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল? কারণ হাসিনা তখন যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছিল তা-ই জনগণকে গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে বাধ্য করেছে। চব্বিশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল গ্রাফিতির মাধ্যমে। সেগুলোর মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। বৈষম্যহীন আকাঙ্ক্ষা মানেই বামপন্থী আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী যারা ক্ষমতাসীন হয়েছে তারা সবাই বৈষম্যবাদী ডানপন্থী শক্তি। এটাই সমাজের অন্যতম দ্বন্দ্ব। ফলে বামপন্থীরা যখন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে তখন তাদের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠী নানা আক্রমণ করছে। সমাজ অভ্যন্তরের বৈষম্যহীন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে বামপন্থী রাজনীতিকে নানাদিক থেকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে হবে।’
আলোচনা সভায় বাসদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু তাঁরা রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার না করে রাষ্ট্রের ইতিহাসকে বিকৃত করা শুরু করেন। একইভাবে মব সন্ত্রাস, সংখ্যালঘু, মাজারে, বামপন্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের নামে অনেক মিথ্যা মামলা ও হয়রানি করে বিচার প্রক্রিয়াকে লঘু করেছে। নির্বাচন হওয়ার পর বিএনপি সরকার সর্বসম্মত সংস্কারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, এমনকি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার লঙ্ঘন করেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা থাকলেও অর্থনৈতিক সংস্কার না হলে বাস্তবে সংস্কার হয় না। মানুষকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা হয় না, অসম্মান করা হয়। রিকশাওয়ালা, প্রবাসী শ্রমিক, নারী তথা সাধারণ মানুষ সবাইকে অভিজাত শ্রেণির দ্বারা অসম্মান করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে জনগণকে অপমান করেছে এখনো একই প্রক্রিয়া চলছে। ফলে জনগণের ক্ষোভ আছে। বাম রাজনীতির কাজ হওয়া দরকার জনগণকে ক্ষমতায়িত করা।’
সভাপতির বক্তব্যে বাসদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় নাই। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে এই ব্যবস্থাকে চেনা জরুরি। সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়। সরকার পাল্টালেও রাষ্ট্র পাল্টায় না। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা হচ্ছে বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা যত দিন আছে, তত দিন মানুষের জীবনে দুর্ভোগ থাকবেই।’