জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নিজেদের পালে জোর হাওয়া পায় জামায়াতে ইসলামী। সেটা আরও বেগবান হয় জাতীয় নির্বাচনে দলটির অভূতপূর্ব সাফল্যে। কিন্তু সংসদে ও মাঠের রাজনীতিতে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন দলটির সংসদ সদস্য ও নেতারা। এতে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে দলটিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দু-একজন নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো দলকে দায় দেওয়া না গেলেও দলের ভাবমূর্তিতে এমন ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে করেছেন না জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দলের নীতি-আদর্শের জায়গা থেকে অন্যায়, অনিয়ম বা অনৈতিক কাজের কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় নেই। কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়লে দল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। তাই মানুষ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখে।’
সর্বশেষ আলোচনায় সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। এক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে জামায়াত জানিয়েছে, তাদের নিজেদের তদন্তে নজরুলের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে দলটি।
এর আগে নড়াইল-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর বিরুদ্ধে সাংসদের ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানপ্রাপ্তদের অনুমোদিত তালিকায় তাঁর মেয়ের নাম থাকার অভিযোগ ওঠে। একই তালিকায় নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার মানুষের আধিক্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি দাবি করেন, তালিকা তৈরির দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব।
সংসদে বক্তব্য দিয়েও বিতর্কে জড়ান জামায়াতের এক সংসদ সদস্য। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে গত ১৪ জুন দেওয়া বক্তব্যে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজের জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি ভুল স্বীকার করেন এবং সংসদের কার্যবিবরণী সংশোধনের জন্য স্পিকারের কাছে আবেদন করেন।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল অন্যের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম নিজের নাতনিকে উপহার দেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে দলের সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে সাইকেলটি ফেরত দিয়ে অন্য উপকারভোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি সৎ মানুষের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সেই ভাবমূর্তির জন্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
হাসানুজ্জামানের ভাষায়, ‘যে দলেরই হোক না কেন, জনপ্রতিনিধিদের এ ধরনের অনৈতিক কাজ অবশ্যই নিন্দনীয়। জনগণ তাঁদের প্রতিনিধিকে স্বচ্ছ ও সুচরিত্রের অধিকারী হিসেবে দেখতে চায়। কাজেই এটা অবশ্যই জামায়াতের ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’