হোম > রাজনীতি

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না: নাহিদ ইসলাম

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

নাহিদ ইসলাম। ফাইল ছবি

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হলে এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক গণসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কে এনসিপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আয়োজিত গণসমাবেশে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের পরিবর্তনের জন্য, ‘সংস্কারের জন্য আমরা গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা আপনাদেরকে বলেছিলাম যে, গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিন। “হ্যাঁ” ভোট দিলে দেশের সংস্কার হবে, পুলিশের সংস্কার হবে, বিচারব্যবস্থার সংস্কার হবে, স্থানীয় সরকারের সংস্কার হবে, মিডিয়ার সংস্কার হবে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই সরকার যদি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে আমরা এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আরও বলেন, ‘এই সরকার যদি গ্যাস সরবরাহ করতে না পারে, গ্যাসের দাম যদি না কমায়, বিদ্যুৎ যদি সরবরাহ করতে না পারে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চাঁদাবাজির কারণে কেউ ব্যবসা করতে পারছে না। এই সব পরিস্থিতির যদি পরিবর্তন করতে না পারে, আমরা এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না। গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সরকারকে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না।’

সরকারের বিরুদ্ধে দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার অভিযোগ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড ভেঙেছে এই সরকার। বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রাহকের বাসায় ভুতুড়ে বিল আসছে। গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘২০০১ সালের পর আমরা লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি দেখেছি। খাম্বা ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না। আজকে আমরা আবার একই রকম পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, জ্বালানি নেই। অথচ বিদ্যুৎ বিল আসছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, তেলের দাম বাড়ছে।’

দেশের জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেশের তেলের নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাত ও আমদানির দায়িত্ব তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর অভিযোগ, এভাবে দেশের সম্পদ বড় ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, ‘এই সরকার জনগণের সরকার নয়, এই সরকার বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সরকার।’

তাঁর অভিযোগ, ব্যাংক লুট ও ঋণখেলাপির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের কেউ কেউ সংসদ ও মন্ত্রণালয়ে জায়গা পেয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার—সব জায়গায় দলীয় লোক বসিয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এসব কার্ড প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পাচ্ছেন না। বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও তাঁদের ‘সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বাহিনী’ এসব সুবিধা পাচ্ছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং তাঁদের মারধরের অভিযোগও করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জনগণ এই সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখিয়ে দেবে, নির্বাচনে দেখিয়ে দেবে এবং সামনে যে আন্দোলন আসছে, সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েও দেখিয়ে দেবে।’

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আপনাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে দুর্নীতি ও লুটপাট করার জন্য নয়। জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করার জন্য, তেল-গ্যাস সংগ্রহ করার জন্য আপনাদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। ক্ষমতায় বসে আপনাদের সন্তানেরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে লুটপাট করবে, টেন্ডারবাজি করবে—এ জন্য জনগণ আপনাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে না।’

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, যাত্রাবাড়ীর মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে ভুগছেন। অথচ এই যাত্রাবাড়ী গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁদের জন্যই বিচার ও সংস্কার প্রয়োজন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ বলেন, ‘আমরা সংস্কার চাই এবং বিচারও চাই। সংস্কার ও বিচার ছাড়া এই সরকারের কোনো ম্যান্ডেট নেই বলে আমরা মনে করি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার কার্যক্রম যতটুকু এগিয়েছিল, এরপর আর তেমন অগ্রগতি হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

ভারত প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এর যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এসেছে, দেশের গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত এসেছে। সরকার একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে তারেক রহমানের ভারত সফর এ দেশের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকতে পারছে না বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘তারা যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে, সেই জাতীয়তাবাদের কথা বলে তারা সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে পারে নাই। তারা যদি এখন ভারতের সঙ্গে আপস করে, তারা যদি ভারতে সফর করে, তার মানে এ দেশের জনগণ ভেবে নেবে—যেই জাতীয়তাবাদের রাজনীতি জিয়াউর রহমান করেছেন, যেই জাতীয়তাবাদের রাজনীতি বেগম জিয়া করেছেন, সেই জাতীয়তাবাদের ধারক বাহক জনাব তারেক তারেক রহমান নয়।’

সমাবেশ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার, সংস্কার বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কমানো এবং চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কীভাবে দাম কমাবেন, সেটা আমরা জানি না। কোনো অজুহাত দেওয়া চলবে না। আপনাদের হয় ক্ষমা চাইতে হবে, নয়তো এসব পণ্যের দাম কমাতে হবে। কারণ নির্বাচনের আগে আপনারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তেল ও বিদ্যুতের দাম কমাবেন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবেন।’

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন, দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আহ্বায়ক ইসহাক সরকার প্রমুখ।