সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে এখন ‘উল্টো পথে’ পা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেছেন, সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। কিন্তু বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আখতার এসব কথা বলেন। এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এই বৈঠকের আয়োজন করে।
আখতার হোসেন বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত খসড়া আইন বর্তমান কাঠামোতেই সংসদে পাস হলে বাংলাদেশ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যতটুকু অগ্রগতি করেছে, সেখান থেকে আবার পিছিয়ে পড়বে।
তাই সাধারণ নাগরিকদের মতামত নিয়ে আইন দুটি নতুন করে প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের যে খসড়া আইন করা হয়েছে, এভাবেই যদি সংসদে এটি পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, সেই অগ্রগতি থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ব। আমাদের আবার পেছনের দিকে যেতে হবে। আমাদের লড়াইয়ের পথ আরও দীর্ঘ হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আখতার বলেন, মন্ত্রিসভায় আইন অনুমোদিত হওয়াই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সংসদে আইন পাস হলেও তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তাই আইন দুটি সংসদে উপস্থাপনের আগে আবারও পর্যালোচনা করা উচিত।
অতীতের গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলে আখতার হোসেন বলেন, আগের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ছিল। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়টি আইনেই নিশ্চিত করতে হবে।
আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব। নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে—এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, রাজাকার-নন-রাজাকারসহ নানা বিতর্ক সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয় বলে জানান এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না। বিশেষ করে গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছে দেওয়া নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত নয়।
বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। আলোচনায় আরও অংশ নেন আইনজীবী ও সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া, আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য তানিম হোসেন শাওন, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, এবি পার্টির (আমার বাংলাদেশ পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার প্রমুখ।