ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিন্তু হঠাৎ শুরু হওয়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং আইনশৃঙ্খলার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ছয় মাস না যেতেই একটু বেকায়দার মধ্যে আছে সরকার। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে তৎপর বিরোধী দল। এই অবস্থায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় জয় না পেলে ক্ষমতাসীনদের জন্য তা অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই মাঠ থেকে বড় জয় তুলে আনতে সময় থাকতেই প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণ করছে বিএনপি।
বিএনপির নেতারা আশঙ্কা করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে তাঁদের বেগ পেতে হতে পারে। এ জন্য মাঠের নেতাদের আগেভাগে সতর্ক করে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে মনোনয়ন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে। এটা ঠেকাতে না পারলে তা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এর বাইরে ক্ষমতাসীন হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করাটাও বিএনপির জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির অনেক দায়িত্বশীল নেতা। তাঁরা বলছেন, এই নির্বাচনের সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িয়ে আছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নেতা-কর্মীদের আগে থেকেই সতর্ক করা হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বৈঠকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। প্রার্থী সমর্থনের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ না বললেও চলতি অর্থবছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। গতকাল রোববার তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। আমরা নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে মৌখিকভাবে বলেছি। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে দলের একাধিক নেতা চেয়ারম্যান বা অন্যান্য পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। তাঁরা বলছেন, একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন চাইতেই পারেন। এতে দলের আপত্তি নেই। নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ জমজমাট থাকে, নেতা-কর্মীরা চাঙা থাকবেন এবং দলের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকেই সমর্থন দেওয়া হবে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। এই প্রতিযোগিতা যাতে দলীয় কোন্দল বা অর্থের লেনদেনে রূপ না নেয়, সে জন্য কেন্দ্র থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজ করলেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা চাই ভালো ব্যক্তি আসুক। ভালো ও জনপ্রিয় লোকজন আসতে পারে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।’ প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, দলের শৃঙ্খলাপরিপন্থী কিছু যদি হয়, সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতা। এর ফলে অনেক আসনে দলের প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেননি। আবার এর ফলে দলে কোন্দল ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাঁদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।
গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি মইনুল হাসান সাদিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেকোনো মূল্যে ‘একক প্রার্থী’ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় নেতাদের ওপরই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা না পারলে বিভাগীয় নেতারা এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সহযোগিতা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মনোনয়ন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে। বিএনপির নেতারা অবশ্য বলছেন, দলীয় সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাণিজ্য বা ব্যক্তিগত প্রভাব যাতে কাজ না করে, সে বিষয়ে কেন্দ্র সতর্ক থাকবে।
দলটির একাধিক নেতা জানান, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু সুপারিশের ওপর নির্ভর করা হবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান যাচাই করা হবে। মাঠের বাস্তবতা জানতে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে একাধিক উৎস থেকে তথ্য নেওয়া হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থনের ক্ষেত্রে অর্থের প্রভাব যাতে না পড়ে, সেটি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির কৌশলে শুধু দলীয় প্রার্থী ঠিক করাই নয়, ভোটের হিসাবও গুরুত্ব পাচ্ছে। দলের বাইরে থাকা বা আগের নির্বাচনে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে থাকা প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের কীভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে আনা যায়, তা নিয়েও ভাবছে বিএনপি। দলের কোনো কোনো নেতার মতে, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে তাঁর নিজস্ব ভোটব্যাংক, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
এদিকে ক্ষমতাসীন হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করাটাও বিএনপির জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির অনেক দায়িত্বশীল নেতা। তাঁরা বলছেন, এই নির্বাচনের সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িয়ে আছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলের স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁরা বাড়াবাড়ি করলে সরকার ও দল উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।