সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
আজ বৃহস্পতিবার দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগসংবলিত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে রাতে একদল লোক হাসপাতালে প্রবেশ করে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর আবারও হামলা চালায়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথম দফায় পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার পরও তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। হাসপাতাল যদি একজন আহত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়—এ প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। হাসপাতালে হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও তদন্ত করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ গুরুতর হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ বিচার হতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার নামে আইন ভাঙা, হত্যা সংঘটিত করা কিংবা বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। উপরন্তু এটি পবিত্র ইসলামের ধর্মের মূলগত মর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড। সব প্রাণের নিরাপত্তা ও হক আদায় ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা এবং মানুষের জীবন ও আইনি অধিকার রক্ষা—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করবার অধিকার কারোর নেই।
নিহত শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁর চিকিৎসা চলছিল। এ বিষয়টি উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং শামীমের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অডিও বা অভিযোগকে হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বৈধ হয়ে যায় না।
এনসিপি এ ঘটনায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দাবি করছে:
১. হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার: প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। হামলায় উসকানি, জনতাকে সংগঠিত করা কিংবা সহিংসতা সংঘটনে ভূমিকার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
২. হাসপাতালে দ্বিতীয় দফার হামলার জবাবদিহি: চিকিৎসাধীন একজন ব্যক্তির ওপর হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না—তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজবের তদন্ত: যে অডিওকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তার উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার, জনতাকে জড়ো করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সহিংস অপরাধ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: নিহতের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যেন ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই বক্তব্য দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে দ্ব্যর্থহীন। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই হঠাৎ সংগঠিত উত্তেজিত জনতার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে আইন ও বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে।