ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া ভারত সরকারের ‘বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ড’ বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিকে ৫ আগস্ট দেশের ইতিহাসের এক গৌরবময় দিনে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতি চরম অসম্মান ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে বলে অভিযোগ দলটির নেতাদের।
আজ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, গতকাল ভারত থেকে যে সংবাদ সম্মেলন করা হলো—আমরা এটাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের একটি শক্তির হস্তক্ষেপকে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছি। ভারত সরকার এখানে শেখ হাসিনাকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের পর শেখ হাসিনা প্রথম রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিলেন। এর আগে তিনি কোনো ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) সাক্ষাৎকার দিতে পারেননি। গতকাল আমরা প্রথম শুনলাম যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে আসবেন। পরে শুনলাম অনলাইনে আসবেন। পরে দেখলাম চেহারাও দেখানো হলো না। ভয়েস (কণ্ঠ) আসল। যখন কেউ চেহারা দেখাচ্ছে না। সামনেও আসছে না। তখন তো সন্দেহ জাগে যে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। এআই জেনারেটেড কি না সেই সন্দেহ জাগে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ও গ্লোবাল ডায়াসপোরা সেলের প্রধান আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। তিনি বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর মতো একটি ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্ববহ দিনে সার্বভৌম বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এ ঘটনায় নয়াদিল্লি তার বাংলাদেশ নীতি আবারও স্পষ্ট করেছে যে, তারা বাংলাদেশের বা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে নয়, তারা তাদের তাঁবেদার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়েই বাংলাদেশকে দেখতে চায়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি। এমন একজন ব্যক্তি, যাকে বাংলাদেশের জনগণ গণহত্যার জন্য দায়ী বিবেচনা করে সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে বাংলাদেশ থেকে উৎখাত করেছে, দেশের ইতিহাসের এক গৌরবময় ও শোক স্মারক দিনে মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতি চরম অসম্মান ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। এনসিপি মনে করে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক।
ভারত সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সুস্থ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ভারতের উদ্দেশে বলেন, আপনারা বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত ও নিষিদ্ধ গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে, তাদের পক্ষাবলম্বন করে বাংলাদেশের জনগণকে আপনাদের প্রতি চিরন্তন ঘৃণার দিকে ঠেলে দেবেন না।
একই সঙ্গে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকরের লক্ষ্যে যথেষ্ট কার্যকর, দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় এনসিপি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও জবাবদিহি দাবি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য, সমন্বিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করে, যা রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করবে। এই প্রশ্নকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট দায়িত্বশীলতা।
এনসিপির অবস্থান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আমরা গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং সব ধরনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্পূর্ণ বিলোপ বা অবসানের পক্ষে। আমরা শেখ হাসিনাকে কোনো দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সমীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন যেকোনো সমঝোতা বা ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি বিশ্বাস করে, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্টকারী ও জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ জবাবদিহি ও বিচার নিশ্চিত না করে পুনরায় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ দেওয়া চলবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহিন সরকার, ইয়াসির আরাফাত প্রমুখ।