আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে কৌশল বদলাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কাছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ছাড় না পেয়ে একক নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিল এনসিপি। এখন সেখানে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার কথা ভাবছে দলটি। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদকে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ইতিমধ্যেই ভোটদানের (ঠিকানা) এলাকা অদলবদল করেছেন। নাসীরুদ্দীন ঢাকা উত্তর থেকে দক্ষিণে এসেছেন। আর আসিফ ঢাকা দক্ষিণ থেকে উত্তরের ভোটার হয়েছেন।
এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভোটের (ভোটদানের) এলাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে নির্বাচনী এলাকা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েমকে রাখার সিদ্ধান্ত এনসিপির কৌশলে পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করার পর সেখানে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি এনসিপি। দলটির প্রত্যাশা ছিল, জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে জামায়াত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে এনসিপিকে সমর্থন দেবে। সেই সমঝোতা না হওয়ায় বিকল্প কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। এরই অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরা এলাকার ভোটার ছিলেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হয়েছেন। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ধানমন্ডির ভোটার ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন।
এনসিপির গণমাধ্যমবিষয়ক উপকমিটি গতকাল সোমবার দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দলটি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-১৩-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁদের ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন করা হয়। যাচাই-বাছাই ও দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষা শেষে নির্বাচন কমিশন আবেদন অনুমোদন করেছে।
দলীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াতের সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। সে সময় জামায়াতের কাছ থেকে লোকবলসহ বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়েছিলেন পাটওয়ারী। জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তাঁর হয়ে এলাকায় প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে দক্ষিণে তাঁকে প্রার্থী করা হলে জামায়াতের ভোটারদের একটি অংশকে নিজেদের পক্ষে টানার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করে এনসিপি। একই সঙ্গে জুলাই-পরবর্তী তরুণ ভোটারদের মধ্যেও নাসীরুদ্দীনের যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, সেটিও কাজে লাগাতে চায় দলটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ঠিকানা পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে দলের রাজনৈতিক কৌশলেরও সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সামনে এনে জামায়াতের ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। স্বতন্ত্র মনোনয়ন ফরম নিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারও শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন। আর এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচন করে। জামায়াতের কাছে ছাড় না পেয়ে আসিফ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। এবারও সেই জামায়াতের বাধায় দক্ষিণে তাঁর প্রার্থী হওয়া হচ্ছে না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপি আগেভাগেই আসিফকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী করার প্রাথমিক ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর জামায়াত সাদিক কায়েমকে দক্ষিণের প্রার্থী করার কথা বলে। এর পর থেকেই ঢাকা দক্ষিণ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দর-কষাকষি চলছিল। সেখানে চাহিদামতো ছাড় না পেয়ে উত্তরে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
পূর্বের ঘোষণামতো, জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী জোটের দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে দলগুলো।
জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের অন্য দলগুলোর নেতারা বলছেন, তাঁরা শুরু থেকেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের কথা বলে আসছিলেন। এখনো তাঁরা সেই পথেই রয়েছেন। তবে একক নির্বাচন করলেও রাজপথে বিরোধী ঐক্যে পরিবর্তন আসবে না বলে জানান তাঁরা।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জোটে আগেই এ বিষয়ে আলোচনা হয়ে আছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক শরিক দল যার যার মতো করে নির্বাচন করবে। আমাদের নিজেদের মধ্যে সব বিষয়ে বোঝাপড়া আছে। আশা করি, এটা অটুট থাকবে এবং স্থানীয় নির্বাচনের প্রভাব এই ঐক্যে পড়বে না।’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেন, ‘আমরা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় পরিষদে নির্বাচন করতে আগ্রহী নেতাদের ইতিমধ্যে সমর্থন এবং গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছি। এখন পর্যন্ত এককভাবে অংশগ্রহণ করারই ইচ্ছা আমাদের। এতে জোটে ভাঙনের আশঙ্কা দেখছি না, তবে কিছুটা টানাপোড়েন তো হবেই।’