জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়। তিনি ‘নতুন স্বৈরাচার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার হওয়ার ‘অওকাত’ (ক্ষমতা) তাঁর নেই। স্বৈরাচারী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে রাজপথে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠবে।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিএনপি সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক আইন পাস, বিরোধী মত দমন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তারেক রহমানের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ন্যাড়া বেলতলায় একবার যায়, কিন্তু তারেক রহমান বারবার যায়। আমরা তারেক রহমানকেও বলব—দ্রুত সময়ের মধ্যে আপনি সঠিক পথে আসুন, গণতন্ত্রের পথে আসুন।’
নাহিদ আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়, মানবাধিকারও তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়। তারেক রহমান নতুন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যদি নতুন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হন, আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমান শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার হওয়ার বহু আগেই এ দেশের জনগণ রাজপথ প্রকম্পিত করবে এবং তারেক রহমান ও বিএনপির স্বৈরাচারী প্রবণতাকে রুখে দেবে।’
গণ-আন্দোলন আসন্ন—এমন হুঁশিয়ারি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আপনি সবাইকে যেহেতু ক্ষুব্ধ করছেন, জনগণের ভেতরে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তি এখন এই বিএনপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। ফলে ক্রমশ গণ-আন্দোলন আসন্ন।’
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে দুদক নিয়ে নতুন ‘কাণ্ড’ শুরু হয়েছে। সাত মাস পর দুদক পুনর্গঠন করে এনসিপি ও বিরোধী দলকে টার্গেট করা হচ্ছে।
বিএনপির বিগত শাসনামলের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যদি সাহস থাকে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুদকের দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত করুন। এ দেশের মানুষ অতীতেও দেখেছে কারা দুর্নীতি করে। রাস্তায় ইট-পাথর থেকে শুরু করে আপনারা দুর্নীতি করেছেন। এখন মহিষ ঘাস খাবে, সেখান থেকেও চাঁদাবাজি করছেন।’
নাহিদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বিএনপিকে ক্ষমা করে ক্ষমতায় এনেছিল।
এখন বিএনপি দুদককে এনসিপির বিরুদ্ধে ও তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, দেশে ছাগলের মানবাধিকার রক্ষার জন্য বহু লোক থাকলেও মানুষের মানবাধিকার হরণ হলে কথা বলার মতো কোনো বুদ্ধিজীবী পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ বলেন, সরকার নির্বাচন কমিশনকে ‘ভূলুণ্ঠিত’ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ বলেন ‘আমি জানি না, আপনি সেখানে কী জবাব দেবেন। সাধারণত আপনার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ, সংসদে দেখি, আপনি জবাব দেন না অথবা জবাব দিতে জানেন না, কথা বলতে পারেন না। আপনার পাশের জন আপনার হয়ে কথা বলেন। জাতিসংঘে এ রকম ব্যবস্থা আছে কি না অথবা সেখানে কথা বলার সুযোগ পাবেন কি না, আমরা জানি না।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির প্রতিনিধিদল জাতিসংঘে গেলে সেখানে শুধু দলকে নয়, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে। তাই সেখানে জাতীয় ঐক্যের চিত্র তুলে ধরা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির এ নেতা বলেন, ‘আপনি সেখানে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন, শুধু বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন না। ফলে, ভালো হতো, যদি জাতীয় ঐক্য আপনি দেখাতে পারতেন।’
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ বলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু পতিত স্বৈরাচারকে ঠেকাতে তিনি জাতীয় ঐক্য দেখিয়েছিলেন।
নাহিদের অভিযোগ, তারেক রহমান সেই জাতীয় ঐক্য দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে নাহিদ বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে, যে দল বিগত ১৬ বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, তারা ক্ষমতায় এসে এখন জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করছে। যে সরকার, যে দলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার হরণ হয়েছিল, তারা এখন অন্যের মানবাধিকার হরণ করছে।’ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘মদিনার ইসলাম’ কায়েমের কথা বলেছিল, কিন্তু এখন ইসলামবিরোধী আইন কীভাবে পাস করা যায়, সেই চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এসআরবি’ (র্যাব) নিয়ে বিএনপি আগে যে অবস্থান নিয়েছিল, সেটিও তারা ভুলে গেছে। খালেদা জিয়া নিজে এটি বিলুপ্ত করার কথা বলেছেন এবং তারেক রহমানও র্যাব বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন। এখন সরকার অন্য পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘জনগণের কাছে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। জনগণ সবকিছুই বোঝে। জনগণ ইনশা আল্লাহ রাজপথে এবং ব্যালট বাক্সে এর জবাব দেবে।’
মানববন্ধনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।