সরকার কর্তৃক পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, ‘রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া অধিকার ভেঙে প্রতিযোগিতা তৈরির নামে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানির বাজার তুলে দেওয়া হতে পারে।’
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রতিক্রিয়া জানান দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
রাষ্ট্রীয় একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং সীমিত মজুত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের সেক্রেটারি। তিনি বলেন, যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্র কীভাবে নির্দেশ দেবে। অলাভজনক দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বও বেসরকারি কোম্পানি নেবে কি?
গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের বদলে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। তাঁর মতে, ‘এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’
বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে—সরকারের এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন জামায়াত সেক্রেটারি। তাঁর যুক্তি, ‘এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে। এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।’
জামায়াতে ইসলামীর এ নেতার দাবি, বর্তমান জ্বালানিসংকটও বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়। এটি মূলত বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফল।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন বলে পরওয়ার উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর মতে, ‘এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
পরওয়ার বলেন, দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে ৬টি দাবি পেশ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করা, খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে জনমত গ্রহণে ৬০ দিনের সুযোগ দেওয়া, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি, বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার—স্বাধীন নিরীক্ষা; বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ; ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশ করা, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্বের সব সুপারিশ প্রত্যাহার।