দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর নীল আকাশে শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ নিয়ে আসে খুশির সওগাত। আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। উৎসবের ঈদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলমানের হৃদয়তন্ত্রীতে বাজায় এক সাম্যের সুর।
ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সব বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করার নামই ঈদ। বাঙালি মুসলমানের জীবনেও এই উৎসব বয়ে আনে অনাবিল প্রশান্তি, যেখানে সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে মানুষ মেতে ওঠে আনন্দ উদ্যাপনে।
ঈদ যেন নিছক উৎসব না হয়ে ইবাদতেও পরিণত হয়—সে বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে পুণ্যের প্রত্যাশায় ইবাদত-বন্দেগি করে, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।’ এ ছাড়া ঈদের দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া, মিসওয়াক করা, গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সুন্দর ও উত্তম কাপড় পরা এবং কোনো মিষ্টি দ্রব্য খেয়ে আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নত। আমরা চেষ্টা করব এটি আদায় করার।
ঈদের দিনে সাধ্যমতো নতুন পোশাক আর মজাদার খাবারের প্রত্যাশা সবারই থাকে। কিন্তু আমাদের চারপাশেই এমন অনেকে আছেন, যাদের মনে সাধ থাকলেও সাধ্য তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রকৃত ঈদ আনন্দ তখনই সার্থক হয়, যখন তা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষগুলোর ঘরে যাতে খুশির প্রদীপ জ্বলে, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। মনে রাখা প্রয়োজন—পরস্পরের কষ্ট লাঘব আর আনন্দ ভাগাভাগির মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
যখন আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবের আমেজে মেতে উঠি, তখন একদল মানুষ আমাদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করে যায়। র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ডাক্তার, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ইমাম-মুয়াজ্জিন কিংবা নিরাপত্তাকর্মী—অনেকেরই ঈদ কাটে কর্মস্থলে, পরিবার থেকে বহুদূরে। আমাদের সামান্য কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ব্যবহার তাঁদের এই একাকিত্বের কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে। সাধ্য অনুযায়ী তাঁদের সঙ্গে ঈদের আমেজ ভাগাভাগি করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
যাঁদের শ্রম ও ঘামে আমাদের জীবন স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেই গৃহকর্মী, চালক বা কর্মচারীদের ঈদ যেন বিষাদময় না হয়। বেতন-বোনাসের দাবিতে উৎসবের প্রাক্কালে শ্রমিকদের রাস্তায় নামা আমাদের জন্য চরম লজ্জার। পাওনা পরিশোধে অবহেলা করে তাঁদের আনন্দের দিনটি মাটি করার অধিকার কারও নেই। উৎসবের আগেই ন্যায্য প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোই হোক এবারের ঈদের অঙ্গীকার।
সব সংকট ও অস্থিরতা কাটিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এগিয়ে চলুক সমৃদ্ধির পথে। ঈদের এই পবিত্র আলোয় ধুয়েমুছে যাক সব ঘৃণা ও বিদ্বেষ। মুক্তির স্বাদ পাক পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মজলুম মানুষ। উৎসবের রঙে রঙিন হোক প্রতিটি প্রাণ।
সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আন্তরিক শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।