আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলার মানুষ গড়ে তুলেছিল তাদের নিজের আবাসভূমি—বাংলাদেশ। ২৫ মার্চে ইয়াহিয়া সরকার তাদের সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল বাঙালি নিধনের জন্য। তারই পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর এসেছিল বিজয়। বিজয় এসেছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং অন্তত ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের মধ্য দিয়ে। বাংলার মানুষ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, বৈরী পরিবেশে অবরুদ্ধ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে, মনেপ্রাণে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বেড়ে উঠতে দিয়েছে। শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং ক্রমে ক্রমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছে। সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির দোলাচলে পড়েও সেই ৯ মাসের প্রতিটি দিন রক্তাক্ত হয়েছে। কিন্তু তারপর দেশ স্বাধীন হয়েছে।
গুটিকয়েক পাকিস্তানি দালাল ছাড়া পুরো দেশটি তখন বুকের মধ্যে পোষণ করেছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। পাকিস্তানের পদলেহী সেই দালালেরা পুরো একাত্তর সালজুড়ে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে মিলে নৃশংসতা চালিয়েছে। একাত্তরের পত্রপত্রিকায় তার প্রমাণ রয়েছে। সে সময়ের পত্রপত্রিকার খবরগুলোকে নিয়ে বহু বইও প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা থাকলেও সেই দুরভিসন্ধি হালে পানি পাবে না। পাকিস্তানি দালালদের প্রেতাত্মারা এখনো ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তাদের প্রতিরোধ করার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের।
স্বাধীনতার পর মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সে আকাঙ্ক্ষা হয়তো পুরোপুরি বাস্তব রূপ পায়নি; কিন্তু বাঙালি নিজেই নিজেকে শাসন করার জন্য পেয়েছে একটি দেশ, এ সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। সে দেশটি এসেছে আত্মত্যাগের মাধ্যমে। পাকিস্তানের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের মাধ্যমে। সে কথা আমরা যেন ভুলে না যাই।
আজ বাংলাদেশ একটি যুগ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে যারা পরাজিত হয়েছিল, তারা নানাভাবে আবার সংঘবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে বিতর্কিত করে তুলতে চাইছে। এমনকি ১৯৭১ সালের ইতিহাস বিষয়েও তারা তৈরি করছে মিথ্যা বয়ান। জাতীয় সংগীত অবমাননার চেষ্টা করছে। এ সবকিছুই ঘটছে একটা অস্থির সময়ের মধ্যে। এই অবস্থা থেকে পুরো জাতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এবং সে জন্য মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারগুলো পালনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে গোটা জাতিকে। ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করার আকাঙ্ক্ষায় বলীয়ান হয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু তারাই আবার শোষিত হয়েছে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাধ্যমে। ২৩ বছরের বঞ্চনা আর শোষণের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা বাংলাকে বানিয়েছিল তাদের শোষণের পশ্চাদ্ভূমি। সেই কারাগার থেকে বের হয়ে আসার পথটি গড়ে দিয়েছে স্বাধীনতা।
যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে সময়ের অমর মানুষেরা বাংলাদেশ গড়েছিল, যে অঙ্গীকারগুলো তাদের পথের দিশা দিয়েছিল, সেগুলো ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হবে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সার্বিক সুন্দর দেশ গড়ে তোলার বিকল্প কিছু নেই। সেই অঙ্গীকার পালন করতে হলে ফিরে আসতে হবে শিকড়ের কাছে।