আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের একজন অন্যতম গণবুদ্ধিজীবী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম সংগঠক, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের অন্যতম নেতা এবং ‘সর্বজন কথা’ পত্রিকার সম্পাদক। আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কেবল দশম শ্রেণিতে উঠেছি। ১৯৭১ সালের শুরুতে ক্লাস ঠিকমতো শুরু হয়নি। আমরা সেভাবে ক্লাস করতে পারিনি। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় ১ মার্চে। সেদিন আমি একরকম ঘটনাক্রমেই এর সঙ্গে জড়িয়ে যাই। স্কুলে যাচ্ছিলাম, পথে স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছিল পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ। স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হলো না, স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়লাম। পাকিস্তান তখন খুব ভালো ব্যাটিং করছিল, পুরো মাঠের দর্শক পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের বাহবা দিচ্ছিল। হানিফ মোহাম্মদ, ইন্তেখাব আলম, এদের ছক্কা-চারে গ্যালারি উত্তাল। দুপুর ১২টার দিকে আমার পেছনে থাকা একজন লোক রেডিওতে একটা খবর শুনলেন। পাকিস্তানের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান স্থগিত করেছেন। ঘোষণাটা আমি নিজে খেয়াল করিনি, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম স্টেডিয়ামের পুরো চেহারা পাল্টে গেল। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলে উঠল, হইচই শুরু হলো। যে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের এতক্ষণ বাহবা দিচ্ছিল দর্শকেরা, সেই তাঁদের পেছনে দৌড়াতে লাগল তারা মারার জন্য।
এবার স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ধরনের স্লোগান উঠল। সেখান থেকে একটা মিছিল বেরিয়ে গেল, আর সেই মিছিলের সঙ্গে আমিও চলে গেলাম। মিছিল কোথায় কোথায় গেছে জানি না, কিন্তু সেই মিছিল থেকে আর বেরোতেই পারিনি। মিছিল শেষ করে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। এভাবেই আমার শুরু। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনাপ্রবাহ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, আমি ঠিক সেখানেই ছিলাম। ১ মার্চের ওই মিছিলটাই ছিল তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মিছিল।
এই ঘটনার পর বাবা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। ঢাকায় ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম, আমাদের পাড়ার পরিচিত কয়েকজন বড় ভাই আরবান গেরিলা হিসেবে ঢাকায় ফিরেছেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁদের ইউনিট কমান্ডার ছিলেন আব্দুল্লাহিল বাকি, শহীদ বাকি, যাঁর নামে এখানে একটা সরণি আছে। তাঁকে বললাম, আমি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই। এই প্রথম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সরাসরি কথা হলো।
এটা ১৯৭২ সালের ঘটনা, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। যুদ্ধের প্রভাবে তখন তরুণদের মধ্যে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে একটা প্রবল আগ্রহ ও কিছু করার তাগিদ তৈরি হয়েছিল। সেই তাগিদ থেকে আমরা ছোটবেলায় সাইক্লোস্টাইল করে একটা পত্রিকা বের করতাম। ‘অঙ্কুর পরিষদ’ নামে একটা সংগঠনও করেছিলাম। পল্লীমা সংসদে নানা রকম অনুষ্ঠান করতাম। এরই মধ্যে একদিন মনে হলো, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার জন্য কিছু একটা করা যায় কি না। সরকারের তরফ থেকে তখন কিশোর-তরুণদের জন্য এমন কোনো উদ্যোগ ছিল না, তাই আমরা নিজেরাই ভাবলাম, একটা চ্যারিটি সিনেমা শো করে টাকা তুলব।
সেই বয়সেই কীভাবে যে এই পরিকল্পনা মাথায় এল! গুলিস্তানে গিয়ে যত ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস ছিল, সবখানে গিয়ে বললাম যে আমরা এমন একটা শো করতে চাই। একটা সিনেমা পাওয়া গেল, টিকিট ছাপালাম। নিজেরাই সেই টিকিট বিক্রি করলাম, গুলিস্তান সিনেমা হল ভাড়া করলাম। শো হলো। কোন সিনেমা ছিল এখন আর মনে নেই। খরচ বাদ দিয়ে টিকিট বিক্রির টাকা থেকে আমাদের হাতে থাকল প্রায় ৩৫২ টাকার মতো।
এবার প্রশ্ন এল, এই টাকা শেখ মুজিবকে কীভাবে দেওয়া যায়? তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী, কোথায় বসেন, কীভাবে দেখা করতে হয়, কিছুই জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মিন্টো রোডে পুরোনো গণভবন—এখন যেটাকে সুগন্ধা বলা হয়, সেটায় তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একদিন বিকেলে আমরা আট-দশজন হেঁটে হেঁটে সেখানে গেলাম। কেউ কেউ আমার চেয়ে বড়, আবার বেশ কয়েকজন আমার চেয়েও ছোট ছিল। গেটে গিয়ে বললাম, আমরা স্কুলে পড়ি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা দিতে এসেছি। প্রহরীরা একটু অবাক হলেন, আমাদের গেটে বসিয়ে ভেতরে খবর দিলেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এল, ভেতরে যাওয়া যাবে, তার মানে প্রধানমন্ত্রী তখন সেখানেই ছিলেন। গেট থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে দোতলায় উঠতে হলো। আমি জীবনে ওই একবারই সেখানে গিয়েছিলাম।
এর প্রভাব হলো, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, বিপ্লব—এসব বিষয়ে আমার প্রবল আগ্রহ তৈরি হলো। মনে হতো, শেখ মুজিব যদি মার্ক্সবাদী হতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ, মার্ক্সবাদ সম্পর্কে তখন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষত দুই নম্বর সেক্টরে যাঁরা ছিলেন এবং অন্যান্য সেক্টরেও, যেকোনো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেই একটা বিপ্লবী উপাদান তৈরি হয়। তখন চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা—এসব দেশের বিপ্লবের কাহিনি আমাদের কাছে নায়কোচিত হয়ে উঠল, আর তার ফলে আমাদেরও আগ্রহ তৈরি হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার বন্ধুদের মধ্যে ক্লাসেই পেলাম হুমায়ুন ফরিদী, শেখ মঞ্জুরুল হক—ছিলেন আমার রুমমেট, আর ফজল মাহমুদ নামে একজন কবিও ছিলেন আমাদের দলে। যিনি পরে আত্মহত্যা করেন। আমরা ছিলাম একটা ছোট টিম। এর সঙ্গে আমাদের সিনিয়র কয়েকজন ভাই ও আপাও বেশ আগ্রহী ছিলেন। আমরা মিলে বেশ কিছু সংগঠন করেছিলাম। যেমন ‘শিরোনাম’ নামে একটা পত্রিকা বের করলাম, ‘ইকোনমিক স্টাডি গ্রুপ’ নামে একটা স্টাডি সার্কেল (পাঠচক্র) করলাম। প্রতি মাসে একটা নিয়মিত আলোচনা হতো, যাতে বিচিত্রা-সূত্রে পরিচিত ঢাকার অনেককেও নিয়ে যেতাম। একটা লাইব্রেরিও গড়ে তুলেছিলাম। এইসব কাজের মধ্যেই আমি ১৯৭৮ সালের দিকে ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর সঙ্গে যুক্ত হই। তার আগে গ্রন্থাগার, পাঠচক্র, শিরোনাম পত্রিকা—এ সবকিছুতেই হুমায়ুন ফরিদী আমার সঙ্গে ছিলেন; ফরিদী ছিলেন আমাদের সিনিয়র।
মেঘবার্তা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পরপর। তখন ‘দৃক’ এখনকার মতো বড় প্রতিষ্ঠান ছিল না, ছোট আকারের একটা প্রতিষ্ঠান। তাদের একটা অনলাইন সংযোগ ছিল। বাংলাদেশে তখন ইন্টারনেট বলতে মূলত ই-মেইলের একটা ব্যবস্থা সদ্য তৈরি হয়েছে। আর সেটা প্রথম যারা নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে দৃক অন্যতম। তখন টেলিফোন লাইনে ডায়াল করে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হতো, আর যতক্ষণ সংযোগ থাকত ততক্ষণ টেলিফোনের বিল উঠত—এমনই ছিল ব্যবস্থা। সেই সময়ে বাংলাদেশে একটা অনলাইন ম্যাগাজিন বের করাটা অনেকের কাছে একরকম বিলাসিতা মনে হতো। কিন্তু আমার ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীদের মধ্যে তখন একটা আগ্রহ তৈরি হলো যে অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের জায়গাটা ধীরে ধীরে বিকশিত হবে। তাই আমাদেরও এ রকম একটা পত্রিকা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই মেঘবার্তা শুরু হয়, যেখানে দৃকের ইন্টারনেট সুবিধাই ছিল মূল সহযোগিতা। পরে মেঘবার্তার প্রকাশনা নিয়ে দৃকের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য তৈরি হলে আমরা এটাকে ৬৮/২ পুরানা পল্টনের অফিসে নিয়ে আসি। ২০০০ সালে আমি সংগঠন ত্যাগ করলেও মেঘবার্তা এরপর আরও বেশ কয়েক বছর চলেছিল।
‘নতুন পাঠ’ পত্রিকাটা বের হয় ২০০৩ সালে। কয়েকটা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ২০০৪-০৫ সালে আমি জাতীয় কমিটির কাজে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ২০০৫-০৬ সালে ফুলবাড়ির বড় আন্দোলন, তার আগে ২০০৪ সালে টাটাবিরোধী আন্দোলন, এসব নিয়ে চলছিল কাজ। এই আন্দোলনগুলো চলার মধ্যেই ২০১৪ সালে আমরা ‘সর্বজন কথা’ শুরু করি। এই ধরনের একটা উদ্যোগের চেষ্টা আমার আগে থেকেই ছিল। ২০১৪ সালে দেখলাম কয়েকজনকে একসঙ্গে পাওয়া গেল, যাঁদের নিয়ে এটা করা সম্ভব, তখন তাঁদের নিয়েই সর্বজন কথা শুরু করি। এখনো এটা চলছে, আগামী নভেম্বরে এর ১২ বছর পূর্ণ হবে।
এই আন্দোলনটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা বড় ঘটনা। এর কিছু সাফল্য একেবারে চোখে দেখা যায়, আবার কিছু সাফল্য চোখে দেখা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখে।
চোখে দেখা সাফল্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো, গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করা। মার্কিন একটি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গ্যাস রপ্তানি করতে চেয়েছিল, আর এর জন্য ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছিল। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এই চাপ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, মার্কিন দূতাবাস, ভারতীয় দূতাবাস, বাংলাদেশের আমলা-মন্ত্রী, এমনকি একাংশ গণমাধ্যম পর্যন্ত ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল যে গ্যাস রপ্তানি করতেই হবে। এটা কতটা অযৌক্তিক, সে বিষয়ে বুদ্ধিভিত্তিক লড়াইয়ের পাশাপাশি লংমার্চ ইত্যাদির মাধ্যমে যে জনমত তৈরি হলো, তার ফলে গ্যাস রপ্তানি আটকানো গেল। এই কারণেই আজও বাংলাদেশে কিছু গ্যাস মজুত আছে এবং শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনো চলছে। এটা না হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতো, তা চিন্তা করাও কঠিন।
এই শক্তির জায়গাটা হলো, একজন মানুষ হিসেবে চারপাশে যখন দেখি বা শুনি; ধরুন, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে, সরকার ফুলবাড়িতে আবার উন্মুক্ত খনির কথা তুলছে কিংবা শিশুদের ওপর নানা জায়গায় নিপীড়ন চলছে—এসব যখন ঘটে, তখন যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়। যদি এসব না ঘটত, হয়তো আমি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম।