হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পিএইচডি, নিয়োগ ও পদোন্নতির হিসাব

ড. মাহফুজুর রহমান খান

প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি জরিপে উঠে এসেছে, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫৬ শতাংশ শিক্ষকেরই পিএইচডি ডিগ্রি নেই। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। প্রশ্ন হলো, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? এর উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল অপর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ বা গবেষণার সুযোগের অভাবই নয়; বরং আমাদের নিয়োগ ও পদোন্নতি কাঠামোর অন্তর্নিহিত কিছু নীরব অসংগতিও সামনে আসে। এখানে তেমনই একটি কাঠামোগত বৈষম্যের দিক তুলে ধরছি।

দুটি ভিন্ন পথ, হিসাবের ভিন্নতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের সবচেয়ে প্রচলিত ধারাটি হলো—স্নাতকোত্তর শেষ করার পরই (সাধারণত পিএইচডি ছাড়াই) প্রভাষক পদে নিযুক্ত হওয়া। কয়েক বছর শিক্ষকতার পর এঁদের অনেকেই শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশে পিএইচডি করতে যান। এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও ইতিবাচক ধারা, যদিও তাঁদের একটি অংশ আর দেশে ফেরেন না। অন্যদিকে আরেকটি ছোট অংশ রয়েছেন, যাঁরা আগে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আলোচনার সুবিধার্থে প্রথম দলকে ‘ক’ এবং দ্বিতীয় দলকে ‘খ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

মূল অসংগতিটি তৈরি হয় চাকরিকাল বা জ্যেষ্ঠতা (সিনিয়রিটি) গণনার ক্ষেত্রে। ‘ক’ দলের শিক্ষকদের শিক্ষাছুটির পুরো সময়টি তাঁদের চাকরিকালের অংশ হিসেবে গণ্য হয়। ছুটিতে থাকাকালীন তাঁরা পূর্ণ বেতন পান এবং পিএইচডি শেষে দেশে ফিরলে তিনটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্টও লাভ করেন। কিন্তু ‘খ’ দলের শিক্ষকেরা যেহেতু যোগদানের আগেই পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন, তাই গবেষণায় ব্যয়িত ওই সময়টুকু তাঁদের চাকরিকালে যুক্ত হয় না, কোনো ইনক্রিমেন্টও জোটে না।

একটি কাল্পনিক উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। ধরা যাক, ‘ক’ দলের একজন শিক্ষক ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে যোগ দিলেন, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পিএইচডি করতে বিদেশে গেলেন এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ডিগ্রি শেষে ফিরে এলেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে কাগজে-কলমে তাঁর চাকরিকাল দাঁড়াবে ১২ বছর, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রকৃত পাঠদানের অভিজ্ঞতা প্রায় ৮ বছর। অন্যদিকে, ‘খ’ দলের একজন শিক্ষক বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সরাসরি যোগ দিলেন এবং একটানা শিক্ষকতা করলেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে তাঁর চাকরিকাল হবে ১০ বছর—যার পুরোটাই পিএইচডি-পরবর্তী শিক্ষকতা ও গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

অর্থাৎ, প্রকৃত একাডেমিক অভিজ্ঞতায় দ্বিতীয়জন এগিয়ে থাকলেও দাপ্তরিক হিসেবে তিনি পিছিয়ে পড়ছেন।

পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্যের প্রভাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, অধ্যাপক পদে আবেদনের জন্য পিএইচডিসহ ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ওপরের উদাহরণ অনুযায়ী, ‘ক’ দলের শিক্ষক দ্রুত এই যোগ্যতা অর্জন করে ফেলবেন, অথচ ‘খ’ দলের শিক্ষক পিছিয়ে থাকবেন। যদিও প্রথমজনের পিএইচডি-পরবর্তী শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা মাত্র ছয় বছর, আর দ্বিতীয়জনের পূর্ণ ১০ বছর!

এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল একটি পদবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অধ্যাপকদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ক্রমান্বয়ে তৃতীয় গ্রেড থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে এবং দ্বিতীয় গ্রেড থেকে প্রথম গ্রেডে উন্নীত হন। ফলে, কে আগে অধ্যাপক হলেন—সেই জ্যেষ্ঠতার ক্রমটিই পরবর্তী গ্রেডগুলোতে পদোন্নতির সুযোগ নির্ধারণ করে দেয়। এমনকি ক্যাম্পাসে আবাসন বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও এই জ্যেষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল। কেবল এক বা দুই বছরের ব্যবধানও একজন শিক্ষকের পুরো কর্মজীবনের গতিপথ ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা চিরতরে বদলে দিতে পারে।

কেন এই নীতি অন্যায্য এবং ক্ষতিকর

এখানে ‘ক’ দলের শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার বা সুবিধা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। তাঁদের অনেকেই কঠোর পরিশ্রমে ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল্যবান অবদান রাখছেন। শিক্ষাছুটি বা এর সুবিধাদি কমানোও এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। মূল প্রশ্নটি হলো, নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়ে: যে পিএইচডি একজনের ক্ষেত্রে চাকরিকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও আর্থিক প্রণোদনার (ইনক্রিমেন্ট) উৎস, হুবহু একই পিএইচডি আরেকজনের ক্ষেত্রে কেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে না?

এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে। বিদেশে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফেরার কথা ভাবছেন—এমন একজন মেধাবী তরুণ গবেষক যখন দেখবেন যে এখানে যোগ দিলে তাঁর গবেষণার মহামূল্যবান সময়টুকু গণনার বাইরে থেকে যাবে, কোনো ইনক্রিমেন্ট মিলবে না এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তিনি সমসাময়িক সহকর্মীদের তুলনায় অনেকখানি পিছিয়ে থেকে কর্মজীবন শুরু করবেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিরুৎসাহিত হবেন। এই হিসাব-নিকাশ তাঁকে বিদেশে থেকে যেতে বা দেশে ফিরে অন্য কোনো পেশা বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে।

অন্যদিকে, তরুণ স্নাতকদের কাছেও ভুল বার্তা যায় যে—আগে চাকরিতে ঢুকে পড়াটাই বেশি লাভজনক, পিএইচডি পরে করলেও চলবে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থাটি প্রকৃতপক্ষে পিএইচডি সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে নিরুৎসাহিত করছে। ইউজিসির জরিপে উঠে আসা পিএইচডিবিহীন শিক্ষকের উচ্চ হারের পেছনে এটিই একমাত্র কারণ—এমন দাবি হয়তো করা যাবে না, তবে এই কাঠামোগত প্রণোদনা যে এর অন্যতম একটি বড় অনুঘটক, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সমাধানের রূপরেখা

এই কাঠামোগত অসংগতি দূর করার সমাধান খুব একটা জটিল নয়। বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একসময় কেবল পিএইচডি ডিগ্রিধারীদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। যদিও বর্তমান বেতনকাঠামো, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় এটি হয়তো রাতারাতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তবে অন্তত দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে এই নীতি কার্যকর করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখন থেকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, আশু পদক্ষেপ হিসেবে পিএইচডি সম্পন্ন করে আসা গবেষকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সমান্তরাল নিয়োগ (প্যারালাল রিক্রুটমেন্ট) ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি সহজ ও বাধামুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি, পিএইচডি সম্পন্ন করে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের ডিগ্রির ন্যায্য স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের গবেষণার একটি নির্দিষ্ট সময়কালকে মূল চাকরিকালের (সিনিয়রিটি) সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাঁদের সমসংখ্যক অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।

শেষ কথা

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ শেষ পর্যন্ত এর শিক্ষক ও গবেষকদের মান ও মেধার ওপরেই নির্ভর করে। বিদেশে বা দেশে যাঁরা পিএইচডি করেছেন, তাঁদের দেশের সেবায় যুক্ত হওয়ার পথটি যত মসৃণ ও সম্মানজনক হবে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সংস্কৃতিও তত বেশি সমৃদ্ধ হবে। যে কাঠামো একজন উচ্চশিক্ষিত পিএইচডিধারীকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে উল্টো পিছিয়ে দেয়, তা সংস্কারের সময় এখনই। কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ থেকে নয়; বরং কেবলই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং দেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বিষয়টি উত্থাপন করছি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

ড. মাহফুজুর রহমান খান, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়