আদিমকাল থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজেছে কোনো দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে ভেসে আসা বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের সংকেত। আমরা সন্ধান করেছি এলিয়েন বুদ্ধিমত্তার, দূরতম গ্যালাক্সিতে কান পেতে শুনেছি ভিনগ্রহের কোনো বার্তা পাওয়া যায় কি না। কিন্তু প্রকৃতির কী অদ্ভুত রসিকতা বা আমাদের বোঝার নির্বুদ্ধিতা যে ভিন্ন বুদ্ধিমত্তা ও মহাজাগতিক চেতনার খোঁজে আমরা গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে চোখ মেলে রেখেছি, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্বের প্রজ্ঞাময় রূপ আমাদেরই চারপাশের অন্ধকার নীল জলরাশির নিচে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বমহিমায় বহমান।
মানুষ যখন বিশালাকায় তিমিকে কেবল বাতি জ্বালানোর তেল আর চর্বির উৎস হিসেবে দেখত, তখনো এরা একই গভীর ভাষায় নিজেদের ভালোবাসত এবং অস্তিত্বের জানান দিত। মহাসমুদ্রের হাজার হাজার ফুট গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে মানুষের চোখ এড়িয়ে সাগরের গভীরে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছিল তাদের সেই ঘোষণা: ‘আমি এখানে আছি, আমি জীবিত আছি।’
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবকেন্দ্রিক অহংকারের এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এই সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বায়ো-অ্যাকোস্টিকসের সমন্বিত প্রয়াস আমাদের চোখের সামনে থেকে অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। ‘প্রজেক্ট সেটি’র (Project CETI) মতো বৈশ্বিক উদ্যোগের সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো মানবজাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্পার্ম তিমি এবং হ্যাম্পব্যাক তিমির জটিল ধ্বনিতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে ডমিনিকার সমুদ্র উপকূল থেকে পাওয়া ডেটা আমাদের জানাচ্ছে, তিমির নির্গত ‘ক্লিক’ কিংবা দীর্ঘ সুরিল গান কেবল কোনো প্রজাতিগত সহজাত যান্ত্রিক শব্দ নয়; মানুষের ভাষার মতোই এদের ভাষায়ও লুকিয়ে আছে উচ্চতর ব্যাকরণ—যেখানে রয়েছে নির্দিষ্ট ছন্দের ‘কোডা’, নিখুঁত গতি, মাত্রা, এমনকি মানুষের উচ্চারিত স্বরবর্ণ এবং দ্বিস্বরবর্ণের মতো জটিল অ্যাকোস্টিক স্থাপত্য।
ইউসি বার্কলের ভাষাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, তিমির সংকেত প্রকাশের বিন্যাসে দ্বৈততার রীতিনীতি রয়েছে। যখন একটি স্পার্ম তিমি ‘এ-কোডা’ কিংবা ‘আই-কোডা’র মতো সুর তৈরি করে, কিংবা এক স্বরবর্ণ থেকে অন্য স্বরবর্ণে মসৃণভাবে গড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল যোগাযোগের প্রয়োজন মেটায় না, তা প্রমাণের স্বাক্ষর রাখে এক গভীর ভাব প্রকাশের। এমনকি এআই বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, শ্রোতাভেদে কথা বলার সংবেদনশীল কৌশল, অর্থাৎ ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘অডিয়েন্স ডিজাইন’ বলা হয়, তা তিমিসমাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চর্চিত হয়। একজন মানুষ যেমন বিচারক, বন্ধু কিংবা অবুঝ শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় ভাষার সুর বদলে নেয়; তিমিরাও গোত্রের বয়োজ্যেষ্ঠ, সমকক্ষ কিংবা সদ্যজাত ছানার উদ্দেশ্যে কথা বলার সময় তাদের শব্দসংকেতের ধরন বদলে ফেলে।
এই ভাষাতাত্ত্বিক জটিলতা বিজ্ঞানীদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—‘থিওরি অব মাইন্ড’ বা অপরের স্বাধীন মানসিক অবস্থা অনুধাবন করার বিরল সক্ষমতা। কোনো প্রাণীর ভাষায় শ্রোতা অনুযায়ী পরিবর্তনের এই মানসিক নমনীয়তা তখনই সম্ভব, যখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে তার সামনের অন্য সত্তাটিরও একটি নিজস্ব স্বাধীন মন, অনুভূতি এবং চিন্তার জগৎ রয়েছে। এটি কোনো যান্ত্রিক জৈবিক প্রবৃত্তি নয়। স্পার্ম তিমির ছানারা মাতৃগর্ভ থেকে ভাষা শিখে জন্মায় না; মানুষের ছানার মতোই তারা সমুদ্রের গহ্বরে ভাঙা ভাঙা অস্পষ্ট শব্দে ‘বাবলিং’ করে, ভুল করে, অনুকরণ করে এবং অভিভাবক তিমির তদারকিতে ধীরে ধীরে কথা বলতে শেখে। জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহে কায়িক অনুশীলনে তারা যে প্রথম শব্দটি শেখে, তা তাদের পরিবার বা গোত্রের নাম; বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘আইডেনটিটি কোডা’। এটি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পরিবাহিত অর্জিত সাংস্কৃতিক জ্ঞান বা কালচারাল ট্রান্সমিশন।
অথচ, এই অভূতপূর্ব প্রজ্ঞা ও চেতনার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস চরম ট্র্যাজেডি ও রক্তক্ষরণে চিহ্নিত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন মার্কিন তিমিশিকারি জাহাজগুলো সাগরের নতুন নতুন অভয়ারণ্যে হানা দিত, তখন প্রথম দিকে তাদের শিকারের সাফল্য ছিল অসামান্য। কিন্তু সেই যুগের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের দিনলিপি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, নতুন কোনো সাগরে জাহাজ পৌঁছানোর আড়াই বছরের মাথায় হারপুন মেরে তিমি শিকারের হার এক ধাক্কায় ৫৮ শতাংশ কমে যেত। তিমিরা ভয়ে পালিয়ে যায়নি; বরং প্রথম আক্রমণের মুখে বেঁচে যাওয়া প্রবীণ তিমিরা তাদের জটিল ‘কোডা’র মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল দূর-দূরান্তে অবস্থানরত অন্য তিমিদের কাছে বিপদের এই তথ্য পৌঁছে দিয়েছিল। যেসব তিমি কখনো মানুষকে দেখেনি, তারাও হাজার মাইল দূরে বসে সেই মৌখিক সতর্কবার্তা শুনে আত্মরক্ষা ও জাহাজ এড়িয়ে চলার কৌশল রপ্ত করে নিয়েছিল।
১৮২০ সালের ২০ নভেম্বর ঘটে যাওয়া বিখ্যাত ‘এসেক্স’ জাহাজের সলিলসমাধি, যা পরবর্তীকালে হারম্যান মেলভিলকে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘মবি ডিক’ রচনার রশদ জুগিয়েছিল, তার নেপথ্যেও ছিল এক করুণ অ্যাকোস্টিক ট্র্যাজেডি। জাহাজের ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ ও ধাতব অংশে নাবিকদের হাতুড়ি দিয়ে ছন্দময় ঠুকঠাক করার শব্দকে বুল স্পার্ম তিমিটি অন্ধ আক্রোশে আক্রমণ করেনি। বিজ্ঞানের চোখ এখন বলছে, তরল জলের মাধ্যমে হাতুড়ির সেই ছন্দময় আঘাতের কম্পন তিমিটির কানে গিয়ে পৌঁছেছিল হুবহু স্পার্ম তিমিসমাজের নিজস্ব ‘ক্লিক-কোডা’ বা বাক্সংকেত রূপে। সে ভেবেছিল প্রকাণ্ড ওই কাঠামোর ভেতর থেকে তার নিজের ভাষারই কোনো সত্তা সংকেত পাঠাচ্ছে, আর সে কেবল সেই রূপক বার্তার উত্তর পাঠাতেই ধেয়ে এসেছিল সাগরের বুক চিরে।
বিংশ ও একুশ শতকের আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন এই মহাজাগতিক প্রতিবেশীদের জীবনকে এক বিভীষিকাময় শব্দ-কারাগারে পরিণত করেছে। বাণিজ্য তরণির প্রপেলার, মিলিটারির উচ্চশক্তির সোনারের (Sonar) শব্দ এবং ডায়নামাইট ব্লাস্টিং মহাসমুদ্রের আদিম নিস্তব্ধতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। যেসব প্রাণীর চোখ বলতে শব্দ (ইকোলোকেশন), তাদের ক্ষেত্রে অনবরত এই যান্ত্রিক কোলাহল কান ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটায়, পথ ভুলিয়ে দেয় এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অকালে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। পরিবেশবিদদের সেই সাবধানবাণী আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য: ‘বধির তিমি মানেই মৃত তিমি।’
তবে অন্ধকারের শেষেই আলোর রেখা দেখা যায়। বৈশ্বিক আইনি দর্শনে আজ এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটছে। নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠী ও কুক আইল্যান্ডের আদিবাসী নেতাদের যৌথ চুক্তির মাধ্যমে তিমি আজ লাভ করেছে আইনি ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি—লিগ্যাল পারসনহুড। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ল স্কুল এবং প্রজেক্ট সেটি আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রাপ্ত তিমির ভাষার নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রাণীদের স্বাধিকার ও আইনি সুরক্ষার নতুন সনদের খসড়া তৈরি করছে।
মহাজাগতিক অনুসন্ধানী কার্ল সাগান যখন ১৯৭৭ সালে ভয়েজার মহাকাশযানে পৃথিবীর বার্তা হিসেবে ‘গোল্ডেন রেকর্ড’ পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি বিজ্ঞানী রজার ও কেটি পেইনের রেকর্ড করা হ্যাম্পব্যাক তিমির সুরেলা গানকে মানবভাষার পাশাপাশি স্থান দিয়েছিলেন। সাগান বুঝেছিলেন, অসীম শূন্যতায় ভেসে চলা এই গ্রহে মানুষ একাকী কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়।
আমরা যখন সুদূর ছায়াপথে বুদ্ধিমত্তার বার্তা খুঁজি, তখন আমাদের অনুধাবন করা উচিত—যে প্রজ্ঞা, চেতনা এবং সামাজিক ভাষার বন্ধন আমরা আকাশে খুঁজছি, তার এক গভীর উত্তর বহমান আমাদেরই সাগরের তলদেশে। তিমিরা তাদের অ্যাকোস্টিক সংকেতে, তাদের গানে এবং তাদের জটিল সমাজে যে বার্তা হাজার বছর ধরে বজায় রেখেছে, তা কোনো দুর্বোধ্য হেঁয়ালি নয়; তা আসলে সমগ্র পৃথিবীর বুকে বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্বের এক অদম্য, মহিমান্বিত ও সরল ঘোষণা—
‘আমরা এখানে আছি।’
এখন প্রশ্ন হলো, নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হওয়া মানুষের সমাজ কি সেই সুর শোনার মতো যথেষ্ট সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পেরেছে?
বিজ্ঞানবক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত