একসময় দীর্ঘদেহী, পাঞ্জাবি পরিহিত ও ভারী চশমা পরা মানুষটিকে দেখা যেত মুক্তাঙ্গন, প্রেসক্লাবসহ ঢাকা শহরের জনগণের পক্ষের অধিকাংশ মিছিল, প্রতিবাদ-সমাবেশে। কখনো গণসংগীত গাইছেন কোনো প্রতিবাদী অনুষ্ঠানে, আবার কখনো বক্তব্য দিচ্ছেন নাগরিক অধিকারের পক্ষে আর রাষ্ট্রের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। তিনি শুধু গণসংগীতশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন মেহনতি মানুষের বন্ধু। সেই কামরুদ্দীন আবসার মৃত্যুবরণ করেছেন ৩০ মে। এর আগে তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর চলৎশক্তিহীন হয়ে চারদেয়ালে বন্দী জীবনযাপন করেছেন। কারণ, ২০১১ সালে স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি আর সক্রিয় থাকতে পারেননি।
আমরা যখন ছাত্রজীবনে বাম ধারার ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই, সেই সময়ে তাঁর প্রতি অনুরক্ত হই মানুষের মুক্তির আন্দোলনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী গানগুলো শুনেই। তাঁর প্রথম গান শোনার সুযোগ হয়েছিল টিএসসির পাশে সোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর মঞ্চে।
তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় ছাত্ররাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার পর। আবসার ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেকবার আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সবটা স্মৃতি মনে নেই। তবে আজিজ সুপার মার্কেটের নিচতলায় পূর্ণ চন্দ্র দে দাদার বাবুল রেডিও এবং ‘ওয়েব বিজনেস সেন্টার’-এ দীর্ঘদিন আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আজ শুধু বলব বাবুল রেডিওর কথা। এখানে পুরোনো ক্ল্যাসিক্যাল গানের সিডি বিক্রি করা হতো।
পূর্ণদা মূল গানের রেকর্ড থেকে কপি করে সিডি বিক্রি করতেন। সেটাই ছিল দাদার আয়ের পথ। পূর্ণদা ছিলেন একজন গানপাগল এবং পড়ুয়া মানুষ। স্বশিক্ষিত সেই মানুষটিই আমাদের ক্ল্যাসিক গানের ‘কান’ তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেখানে গানের সিডি না কিনলেও ফ্রিতে গান শোনার অবাধ সুযোগ ছিল। ফ্রিতে গান শোনার লোভে প্রায় প্রতিদিনই সেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য যেতাম। সেখানেই আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কামরুদ্দীন আবসার ভাইসহ আরও অনেকের সঙ্গে।
কামরুদ্দীন আবসারদের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। দেশভাগের সময় তাঁদের পরিবার ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার গোপীবাগের অভয় দাস লেনে আবাস গড়ে। তাঁর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর। বাবা আবদুল মুকিত নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে চাকরি করতেন। মা ফাতিমা বেগম কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছিলেন। ঢাকায় তিনি নারীনেত্রী হেনা দাসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। তাঁর কাজ ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারকে রাজি করিয়ে মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসা। হেনা দাসের সহযোগিতায় টিকাটুলীর কামরুন্নেছা স্কুলে ইংরেজির শিক্ষকের
চাকরি পান তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে চাকরিও চলে যায়। কারণ, সরকার নির্দেশ জারি করে টিচার্স ট্রেনিং পাস ছাড়া কেউ সরকারি স্কুলের শিক্ষক হতে পারবেন না। এরপর তিনি টিউশনি করে সংসার চালান।
আবসার ভাইয়ের পড়ালেখা শুরু হয় গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বাবা মারা যান। এরপর মা-ই সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাই বলা যায়, শৈশব থেকেই তাঁকে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে হয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনি ভর্তি হন নারিন্দা সরকারি হাই স্কুলে। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত মিউজিক কলেজ থেকে সংগীতে ডিগ্রি (বি. মিউজিক) পাস করেন ১৯৭৪ সালে।
ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে তাঁর সংযোগ। মায়ের আগ্রহে ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা)। গান শেখার অনেক বয়স পর্যন্ত তাঁর কোনো হারমোনিয়াম ছিল না। ছায়ানটে জাহিদুর রহিমের কাছে রবীন্দ্রসংগীত আর ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে ক্ল্যাসিক্যাল শেখা। এরপর আলতাফ মাহমুদের কাছে গণসংগীতের তালিম নেওয়া। তিনি গণসংগীতে স্থিত হন আশির দশকে লেখক শিবিরে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। একসময় লেখক শিবিরের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর বামপন্থী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয়তা বজায় থাকে। তিনি অসুস্থ হওয়ার আগপর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও মার্ক্সবাদী পরিচয়ে গর্ব করতেন।
তাঁর স্থায়ী কোনো আয়ের পথ ছিল না। একসময় পল্টনের বাসস অফিসের গলিতে মার্ক্সবাদী বই বিক্রি করতেন। এরপর ‘দীপ্র প্রকাশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে গিয়েও আমরা আড্ডা দিয়েছি অনেকবার। কিন্তু গানপাগল মানুষ ব্যবসায় কীভাবে সফল হবেন? ব্যবসা গুটিয়ে ফেললেন।
তারপর তিনি বাসায় গিয়ে শিশুদের গান শেখাতেন। এটাই ছিল তাঁর আয়ের পথ। সে হিসেবে তাঁকে একজন সার্বক্ষণিক সাংস্কৃতিক কর্মী বলা শ্রেয় হবে। তবে তাঁকে সংসারের দায়িত্ব থেকে রেহাই দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র নিয়ে তাঁর সংসার।
জীবনে টানাপোড়েন থাকলেও তা নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো খেদ, হতাশা ছিল না। আমাদের বলতেন, ‘মানুষ হওয়ার সংগ্রামটা জরুরি। তোমরা সেটাই করে যাও।’
তিনি নিজে অনেক গানে সুর দিয়েছেন। কোনোটা কবিতা, কোনোটা ছড়ার। একবার বুঝি ১৩টা গান নিয়ে একটা অ্যালবাম করেছিলেন। লোভহীন মানুষ যে অগোছালো হয়, তাঁর গানগুলো সংরক্ষণ না করাই তা প্রমাণিত হয়।
তাঁর প্রতি যে কেউ আকর্ষিত হতে পারতেন সহজে। কারণ, তাঁর কোনো অহংকার, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ছিল না। মিষ্টভাষী এ মানুষটির অসাধারণ গুণ ছিল কোনো বিষয়ে তীব্র তর্ক-বিতর্কের সময় তিনি শান্ত থাকতে পারতেন। এবার চিরতরেই শান্ত হয়ে গেলেন।