অভিভাবক হওয়া মানে সব সময় নিখুঁত হওয়া নয়। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে শেখা, বোঝা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সন্তানের পাশে ভালোবাসা ও মমতা নিয়ে থাকা।
শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটা দৃশ্য আমি প্রায়ই দেখি। সকালে সন্তানকে নিয়ে আসা মা দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়ান। শিশুটি কাঁদছে, মায়ের চোখও ভেজা। তাঁর মনে তখন একটাই প্রশ্ন, ‘আমি কি ঠিকভাবে আমার শিশুর প্রতিপালন করছি?’ আমি তাঁকে বলি, ‘এই প্রশ্নটা যে আপনার মনে আসছে, সেটাই বলে দেয় আপনি সন্তানের কথা ভাবছেন।’
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভালো অভিভাবক হওয়ার জন্য সব উত্তর জানা প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা, তাকে বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা।
শিশু বয়সে যত ছোটই হোক, সে সব দেখে। আপনি কীভাবে কথা বলেন, রাগলে কী করেন, ভুল হলে কীভাবে সামলান, সবই সে নীরবে লক্ষ করে। আমরা মুখে যা বলি, তার চেয়ে বেশি শেখে আমরা যা করি তা থেকে। তাই সন্তানকে ধৈর্য শেখাতে চাইলে আগে নিজেকেই ধৈর্য ধরে দেখাতে হয়।
একজন অভিভাবক যখন নিজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে দৃঢ় থাকেন, তখন শিশুও নিরাপদ, ভালোবাসাপূর্ণ ও আনন্দময় পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। একজন শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী অভিভাবক শিশুকে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে, প্রশ্ন করতে, ভুল করতে এবং নিজের মতো করে শিখতে সাহস দেন।
শিশুর কান্না আর জেদকে আমরা অনেক সময় শুধু দুষ্টুমি ভাবি। অথচ ছোট্ট শিশুর কাছে এটা প্রায়ই কষ্ট বা ক্লান্তি জানানোর একমাত্র ভাষা। তখন একটু থেমে নরম গলায় জিজ্ঞেস করুন, ‘কী হয়েছে সোনা?’ এই ছোট্ট প্রশ্নেই শিশুর মনে বিশ্বাস জন্মায়। সে বোঝে, তার অনুভূতির মূল্য আছে।
অন্যের সন্তানের সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা করবেন না। কেউ আগে কথা বলে, কেউ পরে। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ একটু সময় নেয়। তুলনা শিশুর আত্মবিশ্বাস কমায় আর উৎসাহ তাকে এগিয়ে যেতে সাহস দেয়। সন্তানের জন্য রোজ একটু সময় আলাদা করে রাখুন। ফোনটা সরিয়ে তার সঙ্গে খেলুন, গল্প করুন, তার আঁকা ছবিটা মন দিয়ে দেখুন। এই অল্প সময়ই শিশুকে জানিয়ে দেয়—সে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিয় অভিভাবক, নিজের প্রতিও একটু কোমল হন। প্রতিটি দিন সমান সহজ হবে না। কখনো ক্লান্তি আসবে, কখনো ভুল হবে, আবার কখনো সন্তানের ছোট্ট একটি হাসিই আপনার পুরো দিনের ক্লান্তি দূর করে দেবে। এটাই অভিভাবকত্বের সৌন্দর্য।
নিখুঁত হওয়ার চেয়ে উপস্থিত থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর হওয়ার চেয়ে বোঝার চেষ্টা করা বেশি শক্তিশালী। আর সন্তানের জন্য আপনার ভালোবাসা তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। চলুন, আমরা শুধু সন্তানকে বড় করে না তুলি, তাদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেরাও আরও ধৈর্যশীল, আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী অভিভাবক হিসেবে বেড়ে উঠি। কারণ, সন্তানের সুন্দর শৈশব গড়ে ওঠে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সম্মান ও বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর।